হযরত আলী (রাঃ) এর বিচক্ষণতা
লিখেছেন লিখেছেন আবু জান্নাত ২০ মার্চ, ২০১৫, ০৮:৩০:২৭ রাত
নফহাতুল আরব নামে আরবি সাহিত্যের একটি কিতাবে ঘটনাটি পড়েছিলাম বহু আগে। আজ হটাৎ মনে পড়লো, তাই শেয়ার করলাম।
হযরত আলী (রা সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানি, যেমন ছিলেন বাহাদূর, তেমনি বিচক্ষণ, বুদ্ধিমত্মা, কৌশলী। বালকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আবু তালেবের পুত্র ও রাসূল (সাঃ) এর চাচাতো ভাই এবং হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর জামাতা, হাসান হুসাইনের (রাঃ) এর পিতা ও ইসলোমের চতুর্থ খলিফা। এখানে তাঁর একটি বিচক্ষণতার ঘটনা উল্লেখ করলাম।
একবার দুই পথিক পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাদের ক্ষুধাও লেগেছিল ভীষণ। খাওয়া-দাওয়া করার জন্য দু’জন মিলে একটা সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো। এরপর পুটলি থেকে বের করে নিলো যার যার খাবার। একজনের রয়েছে পাঁচটি রুটি। অন্য জনের তিনটি।
তারা যখন খাবার খাওয়ার জন্য তৈরি হলো তখন সেখানে এসে হাজির হলো এক মুসাফির। তার বেশভূষা একদম সাদাসিধে। সে বললো,ভাই আমি অভুক্ত। খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমার কাছে কোনো খাবার নেই। তোমরা আমাকে কিছু খাবার দাও।
পথিক দু’জন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। মনে মনে ভাবলো, তারা দু’জন খাবে আর একজন মুসাফির না খেয়ে থাকবে, এ কেমন কথা? তারা মুসাফিরকে তাদের সঙ্গে খেতে বসার অনুরোধ করলো।
তিনজন একসঙ্গে খেতে বসলো। একজনের পাঁচ রুটি। অন্যজনের তিন রুটি। মুসাফিরের শূন্য হাত। তবু তারা রুটি বণ্টনে কোনো তারতম্য করলো না। তারা ভাবলো, কারো সঙ্গে খাবার না থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষুধা তো আর কম লাগেনি। তাছাড়া এক সঙ্গে খেতে বসে একজন বেশি খাবে আর একজন কম খাবে, তাই বা কেমন করে হয়? তিনজন সমান সমান রুটি খেলো।
খাওয়া-দাওয়া শেষ- এবার বিদায়ের পালা। মুসাফির চলে যাবার সময় পথিক দু’জনকে আটটি দিরহাম বখশিস দিলো। বললো, ভাই, আমি শুধু তোমাদেরটাই খেলাম। তোমাদের কিছুই খাওয়াতে পারলাম না। এই নাও আটটি দিরহাম। তোমরা দু’জনে ভাগাভাগি করে নাও।
মুসাফির চলে গেল। কিন্তু সমস্যা বাঁধলো দিরহাম ভাগ করা নিয়ে। যার পাঁচটি রুটি সে বললো, আমার পাঁচটি রুটি ছিল। সুতরাং আমি পাবো পাঁচ দিরহাম। আর তোমার তিনটি রুটির জন্য পাবে তিন দিরহাম।
কিন্তু তিন রুটিওয়ালা এ হিসাব মানতে রাজি হলো না। সে বললো, না, আমি তোমার হিসাবে রাজি নই। আমরা দু’জন খেয়েছি সমান সমান। সুতরাং তুমি পাবে চার দিরহাম, আমি নেব চার দিরহাম।
প্রথমজন বললো, তা কি করে হয়? তুমি তিন রুটির জন্য চার দিরহাম পাবে। আর আমি পাঁচ রুটির জন্য চার দিরহাম পাবো? এটা কি কোনো আইনের কথা হলো?
এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেঁধে গেল তর্ক। কারো কথায় কেউ রাজি নয়। কিছুতেই তারা মীমাংসায় আসতে পারছে না। অবশেষে একজন বললো, শোন এভাবে বিবাদ করে তো কোনো লাভ নেই। চলো,আমরা আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (রাঃ) এর কাছে যাই। তিনি যে বিচার করেন, তাই আমরা মেনে নেবো।
এরপর দু’জন মিলে গেল হযরত আলী (রাঃ) র কাছে। তারা সব কথা খুলে বলে ন্যায় বিচারের জন্য ফরিয়াদ জানালো। হযরত আলী মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনলেন। কিছুক্ষণ তিনি মনে মনে কি যেন ভাবলেন। পরে বললেন, তিনজনে সমান খেয়েছো তো?
উভয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
হযরত আলী বললেন, তা হলে এ নিয়ে এত বিবাদ কিসের? হিসাব তো একেবারে পানির মতো সোজা। পাঁচ রুটিওয়ালা তো তিন রুটি ওয়ালার উপর রহম করে বলছে তুমি তিন দিরহাম নাও, কিন্তু ন্যায় বিচার হিসাবে যার পাঁচটি রুটি সে পাবে সাত দিরহাম। যার তিনটি রুটি সে পাবে এক দিরহাম।
এমন হিসাবের কথা শুনে দুজনেই অবাক হয়ে গেল! সাত দিরহাম আর এক দিরহাম ভাগ হলো কোন হিসাবে তারা কিছুতেই বুঝতে পারল না। হিসাব বুঝতে না পেরে দু’জনই হা করে তাকিয়ে রইল হযরত আলীর দিকে। কিছুক্ষণ পর তিন রুটি ওয়ালা বললেন এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি কি এর ব্যখ্যা দিতে পারবেন? হযরত আলী (রাঃ) বললেন অবশ্যই ব্যখ্যা দিবো। তিন রুটি ওয়ালা বললেন: ঠিক আছে ব্যখ্যা দিয়ে বুঝাতে অবশ্যই আমি মেনে নিব।
তখন হযরত আলী (রাঃ) বললেন, তোমরা ছিলে তিনজন। রুটি আটটি। খেয়েছ সমান সমান। একেকটি রুটিকে তিন টুকরো করলে আটটি রুটি চব্বিশ টুকরো হয়। সুতরাং তোমরা একেক জন খেয়েছ আটটি করে টুকরা। মুসাফির লোকটা আট টুকরোর জন্য আট দিরহাম দিয়েছে।
হযরত আলী বললেন, এবার আসা যাক, কে কতটুকু পাবে সে হিসাবে। দ্বিতীয় জনের তিনটি রুটিতে নয় টুকরো হয়েছে। নয় টুকরোর আট টুকরো সে নিজে খেয়েছে। মাত্র এক টুকরো পড়েছে মুসাফিরের ভাগে। সুতরাং সে এক দিরহামের বেশি কিছুতেই পেতে পারে না। আর একজনের পাঁচ রুটিতে হয়েছে পনেরোটি টুকরো। তার মধ্যে সে নিজে খেয়েছে আট টুকরো। বাকি সাত টুকরো খেয়েছে মুসাফির। সুতরাং সে পাবে সাত দিরহাম।
হযরত আলীর হিসাবের কথা শুনে পথিক দু’জন বিস্মিত হলো। তাঁর বিচার বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে দারুণভাবে মুগ্ধ হলো। তারা আর কোনো ওজর আপত্তি না করে নীরবে মেনে নিলো বিচারের রায়।
বিষয়: বিবিধ
১৮২৪ বার পঠিত, ৩৫ টি মন্তব্য
পাঠকের মন্তব্য:
তো গাজী হলেন কিভাবে? মনে কিছু না করলে জানতে ইচ্ছুক।
احب الصالحين ولست منهم
لعل الله يرزقني صلاحا
ধন্যবাদ।
অপেক্ষায় রইলাম।..........
জাজাকাল্লাহু খাইর।
মন্তব্য করতে লগইন করুন