প্রিয় বই: এক নয় অনেক,অনেকগুলো
লিখেছেন লিখেছেন তবুওআশাবা্দী ২৬ মে, ২০১৫, ০৫:২৬:০০ সকাল
আমার আম্মা ভীষণ বই পড়তেন| তাঁর থেকেই ছোটো বেলায় থেকেই আমার (আমাদের সব ভাই- বোনেরই) বই পড়ার অভ্যাস | “ঠাকুরমার ঝুলি” বা “ঠান দিদির থলে”র রাজকন্যা কাঞ্চনমালার রুপকথার গল্প দিয়েই মনেহয় আমার বই পড়ার স্বপ্ন যাত্রার শুরু |রাক্ষসের প্রাসাদ থেকে রাজপুত্রের হাত ধরে রাজকন্যা কাঞ্চনমালার পালিয়ে যাবার সেই স্কেচটা এখনো দেখতে পাই চোখ বুজলেই | এই লিখাটা লিখতে গিয়ে আমারও কত বই, সেগুলো পড়ার সাথে জড়ানো কতো মানুষ, কতো কথাই যে এখন মনে পরছে! স্কুলের টিফিন না খেয়ে সেই টাকা জমিয়ে মেম্বারশীপ করে লাইব্রেরী থেকে সেবা প্রকাশনীর ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্সস পড়ার স্মৃতিগুলো মনে করে এখনো কখনো কখনো নিজে নিজেই কত যে আনমনা হই! স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার ক'দিন আগেও গল্পের বই পড়ার জন্য আব্বার বকা খাওয়া আজ এতদিন পরেও কানে বাজে! প্রিয় বই নিয়ে এই লেখা লিখতে গিয়ে আমি খুবই বিপদে পরে গেলাম | আমার পড়া বইগুলো থেকে সেরা একটা বই বেছে নেয়া আমার জন্য পরোপুরিই একটা অসম্ভব কাজ | আমিও অসাধ্য সাধনের কোনো চেষ্টা না করে আমার কিছু প্রয় বই নিয়ে লিখব এই লেখায় |
মিডিল স্কুলের (ক্লাস সিক্স আর সেভেন)দিনগুলোতে আব্বার কারণে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর বেশ কিছু বই পরা হলো |আব্বাই এই বইগুলো কিনে এনে আমাদের পড়তে বলতেন | জানি না, এটাই হয়ত ইনডাইরেক্ট মেথড অফ টিচিং| নিজে খুব বেশি বলতেন না এটা করতে হবে বা ওটা করা যাবে না| কিন্তু মিলিটারি কমান্ডারের মত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অনুশীলনে ঘাটতি হতে দিতেন না|আমদের ভাইদের ক্ষেত্রে তার ইনডাইরেক্ট মেথড মনে হয় খুবই ফলপ্রসু হয়ে ছিল|মিডিল স্কুলের শুরুতেই একটা বই পরে মুগ্ধ হলাম সেটা হলো গোলাম মোস্তফার লেখা " বিশ্ব নবী" | আমাদের ছোটো বেলায় রাসুলুল্লাহ সাল্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাললামের জীবনী নিয়ে বাংলায় তেমন বই লিখা হয়নি বা অনুবাদ হয়নি | " বিশ্ব নবী" ছিল তখন রাসুলুল্লাহ সাল্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাললামের খুবই গ্রহণযোগ্য জীবনী | স্কুলের ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী রচনা প্রতিযোগীতায় পাওয়া শেখ সাদী (রাহ লিখা গুলিস্তার সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদটা এতদিন পরও আমার পড়া সেরা একটা বই|| চোখের পানিতে ভেসে সেই একই সময় পড়া হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীটা আবেগ, ভাষা, বর্ণনায় মিলিয়ে এখনো মনের কোনায় বই পড়ার স্মৃতির মধ্যে অমুল্য কোনো ব্লু ডায়মন্ড হয়েই জমে আছে |ঠিক সেসময়ই পরপর পড়া চার খলিফা, হজরত আব্দুল কাদির জিলানি (রহ,হজরত শাহজালাল (রহ, হজরত মনসুর হেল্লাজের (রহ জীবনীগুলো আমার ইসলামকে জানার অনেক সুযোগ করে দিল | হজরত শাহজালাল (রহ উপর লিখা বইটাতে ইসলাম ছাড়াও তত্কালীন মুসলিমদের অর্থ সামাজিক অবস্থার চমত্কার বর্ণনা ছিল |সেই বইয়ের বর্ণনা থেকে সিলেট অঞ্চলের তখনকার রাজা গৌর গোবিন্দের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের কাহিনীই পরেই সাম্প্রদায়িকতা বিষয়টা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হলো | এই বইগুলোই ইসলাম সম্পর্কে জানার ভিত্তি তৈরীর কাজ করে আমার জন্য পরবর্তী সময়ে |
মিডিল স্কুলের শেষটাতে চিটাগাং থেকে ঢাকা এসেছি আব্বার বদলির কারণে- বন্ধুবান্ধব, স্মৃতি জাগানিয়া মন সব রেখে এসেছি পতেঙ্গার সাগর পাড়ের ভেজা বালির নীচে| সাগরের কথা শুনলেই আকুল হই | সাগর নিয়ে লেখা জ্যাক লন্ডনের লিখা বিখ্যাত উপন্যাস " সি উলফ" পরেছিলাম তখন | এটা তখন আমার খুবই ভালো লেগেছিল | আমার পড়া "সী উলফ" বইটা অনুবাদ করেছিলেন কবির চৌধুরী | সাধারণত বিদেশী গল্প উপন্যাসের বাংলা অনুবাদগুলি (ভাবানুবাদ নয়) পরার জন্য খুব মজাদার হয়না | কিন্তু এই বইটা এই দোষ থেকে একেবারেই মুক্ত ছিল | আমি শিওর যে এটা বাংলাদেশেরতো বটেই পশ্চিম বাংলারও সেরা অনুবাদ এই বইয়ের এবং যে কোনো ক্লাসিক বইয়ের অন্যতম সেরা বাংলা অনুবাদ |যখন কাজের চাপে মাঝে মাঝে হাসফাস করে উঠি কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে বিন্দুমাত্র ছুটির সুযোগ থাকে না তখন এর কাহিনী এখনো কত যে আনমনা করে!
ক্লাস এইটের কোনো সময় আমি পড়েছিলাম আমার খুবই পছন্দের - আর্নেস্ট হেমিং ওয়ের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপন্যাস "দা ওল্ড ম্যান এন্ড দা সি"| নোবেল জয়ী এই উপন্যাসে হেমিংওয়ে গালফ অফ মক্সিকোর উপুকুলের বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোর জীবনীর মধ্যে দিয়ে তার একটা দর্শন তুলে ধরেছেন – man can die, but can’t be defeated | শুধু সাগরের প্রতি ভালবাসা নয় একটা কঠিন দর্শনকে অসাধারণ গল্পের মধ্যে দিয়ে বলতে পারার জন্যও এই উপন্যাসটা আমার খুবই প্রিয় |সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগোর যৌবন গত হয়েছে এখন আর তেমন মাছ ধরতে পারে না | প্রতিদিন তার নৌকা করে সে সমুদ্রে যায় আর ফেরে খালি হাতে | অন্যরা হাসাহাসি, উপহাস করে তার দুর্দশা দেখে | নানা পরামর্শ দেয় | তীরে থাকতে বলে | বলে অন্য কাজ করেতে | কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সান্তিয়াগো একাই তার সাগরে মাছ ধরা চালিয়ে যায় | একদিন সে একাকী এক বিরাট তিমি ধরে | সি তিমি তার নৌকা টেনে তীরের অন্য দিকে নিয়ে চলে যায় | খাবার, পানি প্রায় ফুরিয়ে যাচ্ছে তবুও সি তিমিটাকে ছেড়ে না দিয়ে তিমিটাকে তীরে নিয়ে যাবার লড়াইটা চালিয়ে যায় | সেই মর মর অবস্থায় সান্তিয়াগো তিন চার দিন পর তিমিটাকে নৌকার পাশে ভাসিয়ে তীরে নিয়ে আসে | জেলে পারার আর কেউই এতবড় মাছ কোনো দিন ধরতে পারেনি, সবাই সান্তিয়াগোর দিকে তাকায় নুতুন করে সমীহের দৃষ্টিতে| এটাই হলো "দা ওল্ড ম্যান এন্ড দা সি"-র বিখ্যাত গল্প | এই সময়েই পড়া আর্নেস্ট হেমিং ওয়ের আরেকটা উপন্যাস আমার মনে খুবই দাগ কেটেছিল সেটা হলো "এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস" | প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পটভূমিকায় প্রবাসী মার্কিন সৈনিক ফ্রেডেরিক হেনরি এবং নার্স ক্যাথরিন বার্কলির ভালোবাসা আর তার পরম্পরায় ঘটা ঘটনার বর্ণনা নিয়ে এ এক অসাধারণ উপন্যাস | প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পটভূমিকায় এটাকে সেরা মার্কিন যুদ্ধ উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন তার জীবনীকার মাইকেল রেনল্ডস |
আমাদের হাই স্কুলে ইংলিশের টিচার আব্দুল আজিজ বিশ্বাস স্যার ছিলেন খুবই প্রাকটিসিং মুসলিম | নামাজ, রোজা আর কুরআন শরীফের বাইরে তার অন্য জীবন ছিল খুবই সীমিত | দেশের এবং বিশ্বের আর্থ-সামাজিক আর রাজনীতি সম্পর্কে খুবই ওয়াকিবহাল বিশ্বাস স্যার ছিলেন ভীষণ আলোকিত একজন মানুষ | বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা ব্রিটিশ দার্শনিক, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক এবং নোবেল লরিয়েট Bertrand Russell কে যখন ষাট দশকের শেষ দিকে যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন সংঘটনের জন্য ব্রিটিশ সরকার জেল বন্দী করে তখন বিশ্বাস স্যার তাকে সমর্থন করে চিঠি লিখেছিলেন | নোবেল বিজয়ী দার্শনিক Bertrand Russell স্যারের চিঠির উত্তরে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন | বিশ্বাস স্যার একদিন আমাদের প্রচন্ড বকা দিলেন বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নোবেল পাওয়া রবীন্দ্রনাথের "গীতাঞ্জলির" প্রথম কবিতাটা মুখস্ত না বলতে পারার জন্য | স্যারের বকা খেয়ে রবীন্দ্রনাথের লিখাগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হলো বাধ্য হয়েই | যেই বইটা দিয়ে আমার রবীন্দ্র সাহিত্যের সাথে পরিচয়ের শুরু সেটা হলো " শেষের কবিতা" | শেষের কবিতার মুগ্ধতা নিয়ে একে একে রবীন্দ্র নাথের সব উপন্যাসই পরা হলো হাই স্কুল শেষ হবার আগেই | একই সময় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের কালেকশন "গল্প গুচ্ছও" পরা শেষ হলো | “এক রাত্রি”, “রবিবার” এ’দুটো এখনো আমার পড়া প্রিয় ছোটো গল্প | আমার মনে আছে, ঢাকা কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের বাংলা পড়াতেন | তাঁর প্রথম ক্লাসে উনি জানতে চেয়েছিলেন আমরা বই পড়ি কিনা | উনি বলছিলেন এখনকার ছেলে মেয়েদের পড়া মানেতো ‘ সেবা প্রকাশনীর’ "মাসুদ রানা" পড়া | ক্লাসের পেছন থেকে আমি হটাত উঠে যখন বললাম স্যার আমরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রও পড়ি, জানতে চাইলেন আমি রবন্দ্রনাথের কি বই পরেছি | আমি যখন বললাম সবগুলো উপন্যাস আর ছোটো গল্পই আমার পড়া, মনে হলো উনি খুব অবাক হলেন শুনে | স্যারের সেদিনের অবাক মুখটা এখনো মনে পরে | আমাদের আরেক জন বাংলার টিচার ছিলেন পান্না কায়সার (অভিনেত্রী শমী কায়সারের মা এবং একাত্তুরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সারের ওয়াইফ) | উনিও তাঁর প্রথম ক্লাসেই জানতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের লিখা আমরা পরেছি কি না | "শেষের কবিতা" যে আমি পরেছি সেটা প্রমান করার জন্য তাঁকে ওই বইয়ের "ঝরনা ধারা" কবিতার খানিকটা আমার মুখস্ত শোনাতে হয়েছিল |রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে পরবর্তিতে নানা কারণে আমার কিছু রিজার্ভেশন তৈরী হয়েছে | অনেকদিন তার কোনো লেখাও আর পড়িনা তবুও কেন জানি কখনো কখনো আমার মনে হয় "শেষের কবিতা", “এক রাত্রি” বা “রবিবার” এখনো পরলেও হয়ত ভালো লাগবে |
এরিক মারিয়া রেমার্কের লেখা আমার খুবই প্রিয় উপন্যাস " অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট" আমি পড়ি এসময় | যুদ্ধ বিরোধী ক্লাসিক উপন্যাস গুলোর মধ্যে এই বইটাকে প্রথম সারির মর্যাদা দেওয়া হয় সবসময়ই | নিজের জীবনে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহন করার অভিজ্ঞতা থেকেই এই জার্মান লেখক যুদ্ধর অমানিবিকতাগুলো মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন তার এই কালজয়ী উপন্যাসে | পরবর্তীকালে হিটলারের সময় এই বই জার্মানি নিষিদ্ধ করে আর এর কপিগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় | স্কুল জীবনে বিটিভি এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে অস্কার পুরস্কার পাওয়া সিনেমাও দেখিয়ে ছিল | বইয়ের মতই আবেদনময় ছিল সিনেমাটা |
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়গুলোতে পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার বই "কথোপকথন" আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয় বই ছিল | সম্ভবত কথোপকথনের তিন নাম্বার বইটা পূর্ণেন্দু পত্রী উত্সর্গ করেছিলেন বাংলাদেশের তরুণ কবিতা ভক্তদের | "কথোপকথন" –এর প্রথম বইটার প্রায় প্রতিটি কবিতা আমার একসময় মুখস্থ ছিল | সবচেয়ে প্রিয় কবিতাটা এত বছর পড়ে এখনো মনে আছে :
নন্দিনী: ধরো একদিন তুমি খুব দুরে ভেসে গেলে/ শুধু তার তোলপাড় ঢেউগুলো আমার বুকের ফ্রেমে/ পেনটিংয়ের মত রয়ে গেল/ এবং তা ধীরে ধুলোয় কুয়াশায় / পোকা মাকড়ের সুখী বাসা বাড়ি হয়ে যায় যদি?/ শুভংকর: ধরো কোনো একদিন যদি খুব দুরে ভেসে যাই / আমারও সোনার কৌটা ভরা থাকবে/ এইসব দিনের ঘন রঙে, বসন্ত বাতাসে, বৃষ্টি ও জলে/ যখন যেমন খুশি ওয়াটার কালারে আঁকা ছবির মত/ ক্রমশ উজ্ব্জল হবে সোহাগী রুদ্দুরে /নন্দিনী: তার মানে সত্যিই চলে যাবে?/ শুভংকর: তার মানে কোত্থাও যাব না |
(সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়া কবিতাটার পুরোটা(?)মুখস্থ লিখলাম কিন্তু না দেখে!)|
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর আমার পড়ার অভ্যাসে খুবই পরিবর্তন হলো | নিজের সাবজেক্টের ত্বাত্তিক দিকের সাথে প্রচন্ড প্রাকটিকাল বা ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতার কারণে হঠাত একসময় আমি খেয়াল করলাম যে কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে লিখা উপন্যাসগুলো আর আমাকে টানছে না | বরং গবেষণা ভিত্তিক লেখাগুলোই আমার বেশি ভালো লাগছে | আস্তে আস্তে সত্যিই ভার্সিটি জীবনের শেষ দিকে একসময় দেখলাম আমি আর গল্প, উপন্যাস আর পড়তে পারছি না |আসলে এটা হলো খানিকটা আমার সাবজেক্টের কারণেই| সোশাল ইকুইটি, সোশ্যাল জাস্টিস বিষয়গুলো একটা সমাজে প্রয়োগ করার জন্য শুধু আইন কানুনই যে যথেষ্ঠ নয় এখানে ধর্মীয় বিধি বিধানের ভুমিকাও যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ এই ধারনাটা থেকেই ইউনিভার্সিটি পড়াশোনার এক পর্যায়ে আমার ধর্ম সংক্রান্ত পড়াশোনা নুতন করে শুরু হলো|
এর ধারাবাহিকতায়ই এসময় কতগুলো খুবই উল্লেখযোগ্য বই পড়া হলো আমার | সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মরিস বুকাইলির "বাইবেল, কুরআন এন্ড দা সাইন্স" | দৈনিক ইত্তেফাকের স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বার্তা সম্পাদক আখতার উল আলম এই বইটার অনুবাদ ধারাবাহিক ভাবে সম্ভবত ইত্তেফাকেই (বা ইত্তেফাক গ্রুপের সাপ্তাহিক রোববার-এ) লিখতেন | পরে বাংলাদেশের কোনো প্রকাশনী তা বই আকারে প্রকাশ করে | এই বইটা এখনো আমার পড়া অন্যতম সেরা একটা বই | এই বইয়ে মরিস বুকাইলি বাইবেল এবং কুরআনে উল্লেখিত বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী নিয়ে একটি তুলনামূলক আলোচনা করে দেখান যে খ্রীষ্টানদের বর্তমান যে ধর্মগ্রন্থ কে বাইবেল বলা হয় তাতে অসংখ্য তথ্য বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং ভুল | বিপরীতে আল কোরানে উল্লেখিত প্রতিটি তথ্যই বর্তমানে সত্যি বলে স্বীকার করে |এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, ইসলাম অনুসরণ করার জন্য বিজ্ঞানের দরকার নেই | এটা বিশ্বাসের বিষয় কারণ কোনো জীবিত মানুষের চোখ কখনো আল্লাহকে দ্যাখেনি এবং দেখবেও না কোনদিন | আল্লাহ আছে কি নেই এটা বৈজ্ঞানিক তত্ব দিয়ে প্রমান করার সুযোগ নেই কখনই | কিন্তু আল্লাহ কুরআন শরীফে অনেকবার বলেছেন যে তিনি অনেক প্রমান ছড়িয়ে রেখেছেন যা "জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য চিহ্ন" (১৬:১৫)যাতে বিশ্বাসীরা আল্লাহকে না দেখেও তাঁর একত্ব অনুভব করতে পারে |কুরআনের তথ্যাবলীর বৈজ্ঞানিক আলোচনা এ'জন্যই হয়ত অপ্রয়োজনীয় নয় | কারণ এতে রয়েছে আল্লাহকে অনুভব করার অকাট্য সব প্রমান | নানা কারণে মরিস বুকাইলির এই বইটা সারা বিশ্বেই খুব আলোচিত হয়েছিল | এই বইটার মাধমেই হয়ত পাশ্চাত্য কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী সম্পর্কে প্রথম একটা বিশদ ধারণা পায় | আর ড: বুকাইলি যেহেতু আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রফেশনালি পাশ্চাত্য ধারার একজন ফিজিশিয়ান ছিলেন তাই তার বক্তব্য সরাসরি উড়িয়ে দেবার সুযোগ ছিল খুবই কম | মরিস বুকাইলির বইটা প্রকাশিত হবার প্রায় দশ বছর পরে আমেরিকার ওহাইও স্টেটের বিখ্যাত কেস ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফিজিশিয়ান ড: উইলিয়াম এফ কেম্পবেল অনেকটা মরিস বুকাইলির উত্তর হিসেবেই একটা বই লিখেন " দা কোরআন এন্ড দা বাইবেল ইন দা লাইট অফ হিস্ট্রি এন্ড সাইন্স" শিরোনামে | এই বই লিখার জন্য তিনি তার ইউনিভার্সিটি থেকে তিন বছরের ছুটি নিয়ে ছিলেন | মূলত ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার মাধমে ড: ক্যাম্পবেল দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে বর্তমান বাইবেলে তথ্যগত কোনো ভুল নেই, যা আছে সবই প্রায় ভাষার ব্যাখ্যাগত কারণে হয়েছে | কিন্তু বর্তমান বাইবেলের যে সব তথ্য বিজ্ঞানের সাথে পরিস্কার ভাবেই সাংঘর্ষিক সেগুলো কেমন ভাবে বাইবেলে সন্নিবেশিত হলো সে বিষয়ে পুরোপুরিই নিরব থেকেছেন | ২০০০ সালে আমেরিকার বিখ্যাত শিকাগো শহরে ড: জাকির নায়েক ড: ক্যাম্পবেলের সাথে এ' সম্পর্কিত একটি ডিবেটে বর্তমান বাইবেলের ২২টি মূলত বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্য তুলে ধরেন তার প্রায় ঘন্টাব্যাপী প্রারম্ভিক বক্তব্যে|এর উত্তরে তার বক্তব্যের শুরুতেই ড: ক্যাম্পবেল ড: জাকির নায়েকের অসামঞ্জস্যগুলোর বিষয়ে স্বীকার করেন “…there are problems that he has said and I do not deny them. And I have not good answers for them.”
একই সময় পড়া আমেরিকার NASA-র সাইন্টিস্ট মাইকেল জে হার্টের লিখা “The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History” বইটা আমার সবসময়ের পড়া সেরা বইগুলোর একটা |১৯৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইয়ে মাইকেল হার্ট পৃথিবীর একশত জন মানুষকে নির্বাচিত করেছেন মানব সভ্যতায় তাদের অবদানের ভিত্তিতে| মাইকেল হার্টের এই লিস্টের প্রথম ব্যক্তিটি হলেন হজরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম)| একজন সেল্ফ ডেসক্রাইবড "হোয়াইট সেপারাটিস্ট" (অন্য ভাবে বলতে গেলে যারা নিজেদের সাদা হিসেবে অন্যদের চেয়ে অগ্রসর মনে করে)হিসেবে মাইকেল হার্টের এই নির্বাচন ছিল খুবই বিস্ময়কর| পশ্চিমী সভ্যতায় ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রসার ও ব্যাপকতা আর তার প্রবর্তক হিসেবে জেসাস ক্রাইস্টের(সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভুমিকা অগ্রায্য করে বা সেক্যুলার সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তক ব্যক্তিদের বা বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগে এর গুরুত্ব অস্বীকার করে ইসলামের প্রবর্তক হজরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নির্বাচন পশ্চিমী দুনিয়ায় খুবই কন্ট্রোভারসি তৈরী করেছিল| এর উত্তরে মাইকেল হার্ট তার নির্বাচনকে সমর্থন করে বলেন যে তিনি মনে করেন মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ধর্মীয় এবং সেক্যুলার সমাজ নির্মানে মানব সভ্যতায় সবচেয়ে সফল ব্যক্তিত্ব (মাইকেল হার্ট এক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফলতা বোঝাতে "supremely successful" কথাটা ব্যবহার করেছেন)| তিনি এটাও বলেন যে ইসলাম প্রবর্তন ও প্রসারে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভুমিকা খ্রীষ্টান ধর্ম প্রসারে জেসাস ক্রাইস্টের (সাল্লাল্লাহী আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ভুমিকা থেকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ| মাইকেল হার্ট তার এই লিস্টে হজরত উমরকেও (রাদিয়াল্লাহু আনহুর)রেখেছেন ৫১ নং স্থানে ইসলাম প্রসারে তাঁর ভূমিকার জন্য |হজরত ওমরের নির্বাচন ক্ষেত্রেও মাইকেল হার্ট বলেছেন যে হজরত ওমরের খিলাফতে মুসলমানেরা এশিয়া, আফ্রিকার যে বিশাল অংশ জয় করে নিয়েছিল তা শুধু তরবারির জোরেই হয়নি | সেই সব দেশের মানুষের আর্থ সামাজিক এবং আত্বিক উন্নতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতাও সে জয়কে স্থায়িত্ব দিয়েছিল | যার জন্য সেইসব দেশের জনগণ শুধু মুসলমানদের অধিনতাই স্বীকার করেনি বরং তারা ইসলামও গ্রহণ করে ছিল|এবং হাজার বছর পরও সেই সব দেশ এখনো ইসলাম ধর্মাবলম্বীই আছে যেই কৃতিত্ব জুলিয়াস সিজারেরও নেই|জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর রোমান সম্রাজ্যের অনেক অংশই বিদ্রোহ করে এবং নিজস্ব স্বাধীনতা আদায় করে |১৯৯২ সালে মাইকেল হার্ট তার বইয়ের রিভাইজড এডিশন প্রকাশ করেন | তাতে তিনি কিছু পরিবর্তন আনেন এবং প্রথম ভার্সনের কিছু নাম বাদ দিয়ে নুতন কিছু নাম অন্তর্ভুক্ত করেন কিন্তু প্রথম দশ জনের ধারাবাহিকতায় কোনো পরিবর্তন করেন নি|শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ যুক্তি এবং বিশ্লেষনী আলোচনায় ভরপুর এই বইটা এখনো আমার পড়া সবসময়ের অন্যতম সেরা বই |
বিষয়: Contest_priyo
২৬৩৮ বার পঠিত, ২১ টি মন্তব্য
পাঠকের মন্তব্য:
শুভকামনা রইল ।
বইটির নাম: বাইতুল্লাহর মুসাফীর।
লেখক: আবু তাহের মিসবাহ
মন্তব্য করতে চাইনা।
'দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি' এর মাছ টিি ছিল মার্লিন তিমি নয়। আমি অবশ্য পড়েছি সেবা থেকে। ইউরোপিয় ক্লাসিক বইগুলি সহজ বাংলায় ও মুল্যে পাঠক এর কাছে পেীছে দেওয়ার জন্য সেবার অবদান অনেক। সব ধরনের বইই পড়া উচিত গবেষনা মুলক বই এর মাঝে বিনোদন এর জন্য ও উপন্যাস কবিতা পড়া উচিত।
আপনার পড়া বই গুলোর স্মৃতি সত্যি অসাধারন! ঠাকুর মার ঝুলি থেকে সব শেস পর্যন্ত চমৎকার কিছু বই দিয়ে পোস্ট টি লিখেছেন যা যথেস্ট সুখপাঠ্য!
আপনার জরিমানা হওয়া উচিত! কেনো? - মেধা অপচয়ের অপরাধে! এত যার পড়া, মেধা যার সমৃদ্ধ আপনার কাছ থেকে অনেক বেশি বেশি লিখা আশা করি আমরা!
প্রতি মন্তব্যের ব্যাপারে সচেতন হউন! জবাবটি মন্তব্যকারী দেখতে পাচ্ছেন না!
শুভাকামনা রইলো!
ধন্যবাদ আপনাকে।
মন্তব্য করতে লগইন করুন