ক্যানন বীচ

লিখেছেন লিখেছেন দ্য স্লেভ ০৭ জানুয়ারি, ২০১৮, ১১:৪৮:৫৩ সকাল





সকালে নাস্তার পর দ্বিতীয় ইনিংসের ঘুম দিলাম চরম। উঠে খানিকক্ষন ফেসবুকিং করলাম। আজ সকালে ঘোরার পরিকল্পনা ছিলোনা। রুমে শুয়ে বসে কাটালাম। নদীর পাশের দরজা খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখী ঠান্ডা বাতাশে সর্বনেসে অবস্থা। দরজা বন্ধ করে জানালা দিয়ে সৌন্দর্য্য উপভোগে মত্ত হলাম। বাইনোকুলারটা বেশ জাতের। কয়েক মাইল দূরের জিনিসপত্র স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নদী দিয়ে চলমান জাহাজের গাছের ছোট ছোট লেখা পড়ছিলাম বাইনোকুলার দিয়ে। বহু বছর আগে আমার একটা বাইনোকুলার ছিলো বেশ দারুন। আমার ভাই দিয়েছিলো বিদেশ থেকে কিনে। সেসময় ওটাই লেটেস্ট ছিলো। খুব শখ ছিলো এয়ারগানের উপর এরকম বাইনোকুলার থাকবে,,,দূর থেকে দেখে পাখি মারব। এয়ারগানও ছিলো কিন্তু এই বস্তু ছিলোনা। পরে সরকার এয়ার গানের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করে। তারপর ওটা নিয়ে ঘোরা হয়নি। তবে শখটা এখনও রয়ে গেছে। এখানে যেকোনো সময় অস্ত্র কিনতে পারি, এমনকি সেমী অটোমেটিক রাইফেলও। আমার অনেক কলিগ নানান শুটিং ক্লাবের সাথে জড়িত। অনেকের ২০/৩০টা নানান রকমের রাইফেল,রিভলবার আছে। কিন্তু আমি অস্ত্র কিনলে আমার উপর নজরদারী হলেও হতে পারে, কারন আমি মুসলিম। এই কারনে অস্ত্র কিনব না। এখানে নিরাপত্তা ১৬ আনাই রয়েছে,ফলে প্রয়োজন নেই, কিন্তু শখ আছে।

এস্টোরিয়া থেকে বিশেষ ট্যুরে তিমি দেখতে যাওয়া যায়। বিশেষ জাহাজে করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যায় এবং তিমি দেখা যায়। কিন্তু সেটার জন্যে বিশেষ পোষাক পরতে হয়,যা প্রবল ঠান্ডা ও বাতাশ প্রতিরোধক। এরকম পরিকল্পনা ছিলোনা,ফলে প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। হোটেলে একটা পত্রিকা পড়ার সময়ই বিষয়টা খেয়াল হল,আগে মনে থাকলে একটা ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু আশা আছে এই ট্যুর একবার দেব ইনশাআল্লাহ।

যাইহোক সকাল ১১টা পর্যন্ত হোটেলে থাকলাম অলসভাবে। এরপর গন্তব্য সেট করলাম ক্যানন বীচ। ভিন্ন একটি রাস্তা ধরলাম। হাইওয়ে ৩০ যা এস্টোরিয়াতে মেরিন ড্রাইভ হিসেবে পরিচিত,,,সেটা ধরে ওয়ারেংটন হয়ে হাইওয়ে ১০১ এ উঠলাম। এই হাইওয়েটি বহুদূর লম্বা। এটা ক্যালিফোর্নিয়াকে ছেদ করেছে লম্বালম্বী এবং মেক্সিকো পর্যন্ত চলে গেছে। এটা হল কোস্ট হাইওয়ে। প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ধরে চলে গেছে এটি। আমিও চললাম।

চলে আসলাম ক্যানন বীচ সিটিতে। যতদূর মনে হচ্ছে,,,আমেরিকাতে এরকম শহর এর আগে দেখিনী। এ এক অসাধারন সুন্দর শহর। সাগর তীরে এটি একটি প্রাগৈতিহাসিক শহর। পুরো শহরের প্রত্যেকটা বাড়ি,দোকানপাট,স্থাপনা,মিউজিয়াম,ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহ সবকিছুই কাঠের তৈরী। বাড়িঘরগুলো তৈরী করা হয়েছে প্রাচীন মডেলে। এই শহরের রাস্তা ধরে হাটলে কেবল হাটতেই ইচ্ছা হবে। এত সুন্দর আর হয়না। এ অসাধারন।

আমি হেমলক স্ট্রীটে গেলাম। সেখানে পাহাড়ী রাস্তার উপরে উঠে দেখী ক্যানন বীচের মূল আকর্ষন আমাকে অভিভাদন জানাচ্ছে। টিলার উপর থেকেছবি তুললাম। মনে হল সাগর তীরে বিনা কারনে বড় একটা পাথরের দলা এসে পড়েছে। এর পাশে আরও দুটো পাথরের স্তম্ভ দাড়িয়ে আছে। দূর থেকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে।

আবার শহরের প্রথম অংশে আসলাম। এবার হাটা শুরু করলাম। খুব দারুন লাগল। আবহাওয়া আজ বসন্তের মত, যদিও শীত কাল। রৌদ্রজ্জ্বল দিন। আমি পেছনে খানিকদূর হাটার পর দেখী সাগরের তীর ধরে খালের মত একটা অংশ বেরিয়ে এসেছে। বালকাময় সে খালে সাগরের পানি প্রশান্ত। চারিপাশে গাছপালা রয়েছে। মানুষের সুন্দর সুন্দর বাড়িও রয়েছে। এখানে দাড়িয়ে কি যে ভালো লাগল ! চারিদিকে তাকিয়ে দুচোখ ভরে সৌন্দর্য্য উপভোগ করলাম। সুবহানআল্লাহ ! অতি সুন্দর ! তীর ধরে খানিক হাটলাম।

এবার শহরের রাস্তায় হাটলাম খানিক। এটা প্রকৃতপক্ষেই ট্যুরিস্ট সিটি। সারাবছরই এখানে পর্যটক ভীড় করে। শত শত বৈচিত্রপূর্ণ ডিজাইনের হোটেল রয়েছে এখানে, প্রায় সবই কাঠের। নিয়ত করেছি এবার সামারে এই শহরে অন্তত ২ দিন কাটাবো ইনশাআল্লাহ। রাস্তায় নানান দেশের পর্যটকরা হাটাহাটি করছে। আমিও হাটলাম। এবার আবারও হেমলক স্ট্রীটের সেই স্থানে আসলাম। এরপর বীচে নামলাম। এখানে মানুষেরা খুব সুন্দর সুন্দর বাড়ি তৈরী করেছে সাগরের তীর ধরে। প্রশান্ত মহাসাগর খুব ভদ্র,,,আটলান্টিকের মত ঝড় ঝঞ্ঝা তৈরী করেনা। ফলে এখানে সাগরের তীরে মানুষ ততটা শক্তিশালী বাড়ি তৈরী করেনা।

তীরে অনেকক্ষন হাটাহাটি করলাম। তীরের যেখানে বিশাল পাথরের স্তম্ভ রয়েছে সেটার কাছাকাছি গেলাম। এখানে প্রবল ঢেউ তৈরী হয় ডুবো পাথরে বাধাপেয়ে। খুব সুন্দর দৃশ্য। এখানে গরমের সময় হাজারে হাজারে মানুষ আসে। আমার ভ্রমন স্বার্থক হল এখানে এসে।

আবারও পুরোনো কালের আবহে গড়া শহরের ভেতর আসলাম। হাটলাম। খাবারদাবার কিনলাম,খেলাম। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। বহুদূর গিয়ে ক্যাম্প ১৮ নামক একটা এলাকায় আসলাম। এটা আসলে বহু পুরোনো একটি লাম্বার কোম্পানীর স্থান। তারা শত বছর আগে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশাল বিশাল গাছ কাটত,তা আমাদের দেশে এখনও ব্যবহৃত হয়না। বিশাল গাছ কাটার পুরোনো সরঞ্জাম এখনও রাখা আছে সেখানে, গাছের বিশাল কান্ড পরিবহনের রেল গাড়িও রয়েছে। পরিত্যক্ত স-মিল রয়েছে। একটি ছোট মিউজিয়াম রয়েছে। আর রয়েছে অসম্ভব সৌন্দর্য্যে মন্ডিত একটি রেস্টুরেন্ট। এটি বিশাল বিশাল গাছের কান্ড দিয়ে তৈরী করা। বাইরে বড় গাছ খোদাই করে নানান প্রাণীর ভাষ্কর্য তৈরী করেছে। ভেতরেও সেরকম ভাষ্কর্য্য রয়েছে। পুরো স্থাপনাটি মোটা মোটা কাঠের দ্বারা তৈরী। বসার টেবিল চেয়ার তৈরী করা হয়েছে আস্ত আস্ত বিশাল গাছ চেরাই করে। রেস্টুরেন্টের সাথে বড় একটি গিফট শপও রয়েছে। নানা সুভ্যেনীর বিক্রী হয় সেখানে।

পেছনে একটি পাহাড়ী সুন্দর নদী প্রবাহমান। সেটার সাথে আছে একটি বুনো পার্ক। এই নদী আর বনভূমির সৌন্দর্য্য যাকে আকৃষ্ট করেনা, অথবা যে এখানে নিষ্পলক তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অতিবাহিত করেনা, তাকে গুলি করে মারা উচিৎ। আমি অবশ্য পলক ফেলতে ফেরতে খানিকক্ষন ছিলাম এবং সৌন্দর্য্য অসহ্য হওয়াতে স্থান ত্যাগ করলাম। সবকিছু সবার জন্যে না রে পাগলা !

এবার বাসার পথ ধরলাম। বহুদূর ড্রাইভ করলাম। ইচ্ছা ছিলো পোর্টল্যান্ডে এসে ভারতীয় রেস্টুরেন্টে একটা বাড়ি দিয়ে যাব। কিন্তু ক্যানন বীচে অনেক সময় ব্যয় করাতে তা আর হলনা। সন্ধ্যার সময় বাসায় ফিরলাম। ফিরেই সাতারে গেলাম। যখনই টায়ার্ড হয়ে যাই, বিশাল সাতার দেই। এতে ক্লান্তি ভাব দূর হয়ে যায়। এর আরেক নাম বিষে বিষ ক্ষয়। রাতে আবার নানান রকম রান্নাবান্নাও করলাম,,,,,কখনও কখনও ক্লান্তি বলে কিছুই থাকেনা ।

বিষয়: বিবিধ

৮১৮ বার পঠিত, ৬ টি মন্তব্য


 

পাঠকের মন্তব্য:

384659
০৭ জানুয়ারি ২০১৮ সন্ধ্যা ০৭:৫৫
আকবার১ লিখেছেন : চমৎকার
আপনার লেখা থেকে:আমি অস্ত্র কিনলে আমার উপর নজরদারী হলেও হতে পারে, কারন আমি মুসলিম। হূম, এই কারনে আমারও কেনা হয়নি। আমরা শীতে কাহিল। আপনি ওরাগনে আবহাওয়া বসন্তের মত। এবার খুব বেশী টানতে পারলেন না।
০৯ জানুয়ারি ২০১৮ সকাল ০৮:১৩
317268
দ্য স্লেভ লিখেছেন : হেহেহেহে....না সবসময় বসন্তের মত না। বৃষ্টি,শীত আছে কিন্তু অতটা চড়া নয়। আপনি কোন স্টেটে আছেন ??
384661
০৭ জানুয়ারি ২০১৮ রাত ০৮:২৯
মনসুর আহামেদ লিখেছেন : ভালো লাগলো ,সৈয়দ মুজতবা আলী
হয়ে যাচ্ছেন। জমি পাওয়া গেছে। HARNEY COUNTY এটাও ওরগানে। আলুর
ষ্টেটে এর পাশে। দাম সস্তা। মোটামুটি,
আমার ফোন: 678-561-8680 মেহেদী হাসান। আপনার ইমেইল পেয়েছি।আমি খুব অলস। ছাগলের উর পড়াশুনা করতে হবে। University of Oklahama, দু'সপ্তাহের ক্লাস । মাছের উপর ক্লাস রয়েছে OHIO STATE UNIVERSITY সপ্তাহে এক দিন, টানা এক বছর। মুশুরের ডালের ক্লাস রয়েছে, University of Idaho তে সপ্তাহে এক দিন, টানা এক বছর। বাংলাদেশে গ্রামের সবাই কৃষক। এখানে কৃষক হওয়া কঠিন। যতেষ্ট আইন কানুন রয়েছ। পড়াশুনার ব্যাপার।
০৯ জানুয়ারি ২০১৮ সকাল ০৮:১৬
317269
দ্য স্লেভ লিখেছেন : খবরটা শুনেই তো পেটের ভেতর আনন্দ লাগছে। ছাগল খাব,ভেড়া খাব,,ডাল খাব,,,, Happy মাছ খাব Happy আপনি এগিয়ে চলেন আমি আছি আপনার সাথে Happy

আসেন কোলাকুলি করি HappyRolling on the Floor Rolling on the Floor
384667
০৯ জানুয়ারি ২০১৮ রাত ১২:৪৮
মনসুর আহামেদ লিখেছেন : কৈ, গেলেন খবর নাই। নাকি খুব টানছেন,Hary County তে ৪০ একর ফামিং জমি পাওয়া গেছে, এইটা GPS
Coordinates 43.58259,-118.771989
গুগলে পেষ্ট করেন এই অংশটুকু(43.58259,-118.771989), জায়গাটা পছন্দ কিনা জানাবেন।
০৯ জানুয়ারি ২০১৮ সকাল ০৮:১৮
317270
দ্য স্লেভ লিখেছেন : ওরে খবর শুনে তো মনের ভেতর ঘন্টায় ৬০০ মাইল বেগে ঝড় বইছে,,,,গতকাল টেনেছি ব্যপক ...দাড়ান ফোন দিচ্ছি

মন্তব্য করতে লগইন করুন




Upload Image

Upload File