রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় মহিলা ছাহাবীগণ চেহারা ঢেকে পর্দা করতেন।

লিখেছেন লিখেছেন েনেসাঁ ১০ জানুয়ারি, ২০১৬, ০৩:৩১:৫২ দুপুর



হামদ ও ছানার পরে আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সত্য দ্বীন ও হেদায়াত সহকারে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। যাতে তিনি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের ইচ্ছায় অন্ধকার পথ থেকে বের করে সত্য-সঠিক আলোর পথে পরিচালিত করেন। তাঁর নির্দেশনাবলী পালন ও নিষেধকৃত কাজগুলো থেকে বিরত থেকে, তাঁর প্রতি পূর্ণ নম্র ও বিনয়ী হয়ে তাঁর ইবাদতকে বাস্তবায়ন করার জন্য আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি নম্র ও বিনয়ী হয়ে আল্লাহর ইবাদতের বাস্তবায়নকে আত্মার কামনা ও প্রবৃত্তির উপর প্রাধান্য দিবেন। মহৎ চারিত্রিক গুণাবলীকে পূর্ণতা দানকারী এবং এর সার্বিক মাধ্যম অবলম্বন করে তার প্রতি আহবানকারী ও অসৎ চারিত্রিক গুণাবলীকে ধ্বংসকরী এবং তাতে নিপতিত হওয়ার সকল পথের সতর্ককারী হিসাবে আল্লাহ তাকে প্রেরণ করেন। যার ফলে সব দিক থেকে পরিপূর্ণ রূপে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর শরী‘আতের আগমন ঘটেছে, যার বিন্যাস ও পূর্ণতা সাধনে কোন সৃষ্টির প্রতি মুখাপেক্ষী হননি। কারণ এটা মহা বিজ্ঞানী আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। যার দ্বারা বান্দাদের সংশোধন করেছেন, তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে।

আর মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী যা দিয়ে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে পাঠান হয়েছে সেটাতো উত্তম চরিত্র, লজ্জার ভূষণ। যাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈমানের অন্যতম শাখা হিসাবে গণ্য করেছেন। এটা অনস্বীকার্য যে, শরী‘আত নির্দেশিত নারীর লজ্জাশীলতাও শালীনতা ও সেই চারিত্রিক গুণে বিভূষিত হওয়া উচিৎ যা তাকে সন্দেহের উপকরণ ও ফিতনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে রাখবে। আর এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, নারীর চেহারা ঢেঁকে পর্দা করা ও ফিতনার স্থানসমূহ আবৃত রাখাই বড় শালীনতা ও লজ্জাশীলতা, যা সে করবে এবং সে গুণে অলংকৃত হবে। যাতে ফিতনা থেকে নিরাপদ ও দূরে থাকতে পারে।

এই পবিত্র অহী ও রেসালাতের দেশ, শালীনতা ও লজ্জাশীলতার পূণ্যময় ভূমির মানুষেরা সুদৃঢ সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। নারীরা প্রয়োজনে ঢিলা-ঢালা পোশাক পরে বড় চাদরে আবৃত হয়ে পর্দা সহকারে বাইরে বের হ’তেন এবং আগন্তুক গায়র মাহরাম পুরুষদের সাথে মেলা-মেশা থেকে বিরত থাকতেন। আর আরবের অধিকাংশ শহরে এই নিয়মই চালু আছে। ফালিল্লাহিল হামদ। কিন্তু পর্দা সম্পর্কে কতিপয় ব্যক্তির আলোচনা ও তাদের আমলহীন দর্শন থেকে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। তারা নারীদের চেহারা উন্মুক্ত করে চলাফিরা করাকে কিছুই মনে করে না। ফলে কোন কোন মানুষের মনে নারীর পর্দা ও তার চেহারা ঢাকা সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দিয়েছে যে,

নারীর পর্দা ও চেহারা ঢাকা ওয়াজিব, না মুস্তাহাব? নাকি অনুসরণীয় কোন অভ্যাস ও প্রথাকে অনুসরণ করে। আর ওয়াজিব না মুস্তাহাব তার কোন বিধানও নির্ণয় করা হচ্ছে না। এই সন্দেহ দূরীকরণ ও বাস্তব সত্য বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্যই আল্লাহর প্রতি আশা রেখে সহজভাবে তাঁর বিধান বর্ণনা করার ইচ্ছায় লিখা আরম্ভ করছি। যাতে সত্য সত্য রূপে প্রকাশিত হয়। আল্লাহ আমাদের সত্যকে সত্য রূপে দেখার ও তাঁর অনুসরণকারী হিসাবে সঠিক দিক নির্দেশনা দানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আর মিথ্যাকে বাতিল রূপে গণ্য করে তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।

হে মুসলিম! জেনে রাখুন, আগন্তুক গায়র মাহরাম পুরুষদের থেকে নারীর পর্দা করা ও তার মুখমন্ডল আবৃত রাখা একটি আবশ্যিক বিষয়। এর আবশ্যকতার প্রমাণ বহন করে স্বয়ং আল্লাহর কিতাব, নবীর সুন্নাত বা হাদীছ, বিশুদ্ধ মতামত ও বহুল প্রচলিত যুক্তি।

কুরআনের দলীল সমূহ :

প্রথম দলীল : আল্লাহর বাণী

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلاَ يُبْدِيْنَ زِينَتَهُنَّ إِلاَّ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوْبِهِنَّ وَلاَ يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلاَّ لِبُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِيْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِيْ أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ أُوْلِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرُوْا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلاَ يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّ وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعاً أَيُّهَا الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ-

‘আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে, তারা যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ব্যতীত তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে, তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতৃপুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের আভরণ প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সকলকাম হ’তে পার’ (নূর ৩১)।

অত্র আয়াত দ্বারা পর পুরুষদের থেকে নারীর পর্দার আবশ্যকতার উপর বহু দিক দিয়ে দলীল গ্রহণ করা যায়।

(ক) আল্লাহ তা‘আলা মুমিন নারীদেরকে তাদের লজ্জাস্থান হেফাযত করার নির্দেশ দান করেছেন। লজ্জাস্থান হেফাযত করার সাথে সাথে তা সংরক্ষণ হওয়ার মাধ্যমগুলো হেফাযত করারও নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে কোন জ্ঞানী সন্দেহে পতিত হবে না যে সে মাধ্যমগুলোর অন্যতম হ’ল, নারীর চেহারা আবৃত করা। কেননা চেহারা খুলে রাখাই তার দিকে তাকানোর কারণ। তার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবা ও আনন্দ পাওয়া এবং এসবই তার সাথে মেলা-মেশার পর্যায়ে পৌঁছার কারণ।

হাদীছে এসেছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, فَزِنَى الْعَيْنَيْنِ النَّظَرُ وَزِنَى اللِّسَانِ النُّطْقُ وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِى وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ أَوْ يُكَذِّبُهُ ‘চোখদ্বয়ের যেনা হ’ল নারীর প্রতি তাকান। জিহবার যেনা হচ্ছে কথা বলা। প্রবৃত্তি (যেনার) আশা-আকাঙ্খা করে। আর লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়ন করে অথবা তাকে যেনা থেকে বিরত রাখে’ (বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭; মিশকাত হা/৮৬)। অতএব মুখমন্ডল ঢাকাই যখন লজ্জাস্থান হেফাযতের মাধ্যম। সুতরাং তা অবশ্য পালনীয়। কেননা মাধ্যম সমূহ ও মূল লক্ষ্যের বিধান অভিন্ন।

(খ) আল্লাহর বাণী وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوْبِهِنَّ ‘আর তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে’ (নূর ৩১)। আর ওড়না হ’ল যা দ্বারা নারী মাথা আবৃত করে। যেমন বোরকার নিকাব। সুতরাং যখন ওড়না দ্বারা বক্ষদেশ ও গ্রীবা আবৃত করা অবশ্য পালনীয় হবে, তখন চেহারা আবৃত করাও অবশ্য পালনীয় হবে। চেহারা ঢাকা হয়তো উপরোক্ত দলীল দ্বারা আবশ্যক, নতুবা কিয়াস দ্বারা। কারণ বক্ষদেশ ও গ্রীবা ঢাকা ওয়াজিব হ’লে চেহারা ঢাকা ওয়াজিব হওয়াটা আরো যৌক্তিক। কেননা চেহারাই হ’ল সৌন্দর্য ও ফিতনার কেন্দ্রভূমি। মানুষের মধ্যে সৌন্দর্য পিয়াসীরা কেবল মুখমন্ডল সম্বন্ধে জানতে চায়। সুতরাং মুখমন্ডল সুন্দর হ’লে দেহের অন্যান্য অঙ্গের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তাকায় না। আর এ কারণে যখন বলা হবে মেয়েটি সুন্দরী, এর দ্বারা শুধু মুখমন্ডলের সৌন্দর্যের কথাই বুঝা যায়। সুতরাং বুঝা গেল মুখমন্ডলই হ’ল চাহিদা ও সংবাদ প্রদানের দিক দিয়ে সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্র। বিষয়টি যদি এমনই হয়, তাহ’লে কিভাবে বুঝা যায় যে, এই বিজ্ঞানময় শরী‘আত বক্ষদেশ ও গ্রীবা ঢাকার আদেশ করবে আর মুখমন্ডল খোলা রাখার অনুমতি প্রদান করবে?

(গ) আল্লাহ তা‘আলা নারীদের সাধারণত প্রকাশমান সৌন্দর্য ব্যতীত অন্য সকল সৌন্দর্য-শোভা প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন। সেটা হ’ল যা প্রকাশ হওয়া আবশ্যক। যেমন পোশাকের বাহ্যিক দিক (যা ঢেকে রাখা সম্ভব নয়)। এজন্য আল্লাহ বলেছেন, সাধারণত যা প্রকাশ পায়; সাধারণত তারা যা প্রকাশ করে বলেননি। তিনি আবার কতিপয় (মাহরাম) ব্যক্তি ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করলেন। ২য় বার নিষেধ করাটা প্রমাণ করে যে, ২য় বারে নিষিদ্ধ শোভা ১ম বারে নিষিদ্ধ শোভা থেকে আলাদা। ১ম শোভা হ’ল বাহ্যিক সৌন্দর্য, যা প্রত্যেক নারী প্রকাশ করে এবং তা গোপন রাখা সম্ভব নয়। আর ২য় শোভা হ’ল গোপন সৌন্দর্য, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত অন্যদের সামনে প্রকাশ করা বৈধ নয়। সেটা আল্লাহর সৃষ্ট হোক যেমন চেহারা অথবা মানব সৃষ্ট হোক যেমন অভ্যন্তরীণ সুন্দর পোশাক যা দ্বারা সে নিজেকে শোভামন্ডিত করে তোলে। যদিও এই সৌন্দর্য বিশেষ ব্যক্তিদের নিকট প্রকাশ প্রত্যেকের জন্য জায়েয। কিন্তু প্রথমটির মতো সর্বসাধারণের জন্য নয়। দ্বিতীয় সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে (নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে) ব্যতিক্রম হ’ল সর্বজনবিদিত উপকারিতা।

(ঘ) আল্লাহ তা‘আলা নারীদের তাদের গোপন শোভা প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছেন এমন পুরুষদের সামনে যাদের যৌন ক্ষমতা নেই। আর তারা হ’ল ঐ সকল দাস যাদের যৌন উত্তেজনা নেই। আর এমন ছোট শিশু, যারা যৌবনে পদার্পণ করেনি এবং নারীদের আকর্ষণীয় অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অনুভূতি হয়নি। এর দ্বারা দু’টি বিষয় প্রমাণিত হয়।-

(i) নারীদের গোপন শোভাগুলো এই দু’শ্রেণীর দূর সম্পর্কীয় মানুষ ছাড়া কারো সামনে প্রদর্শন করা হালাল নয়।

(ii) বিধান ও তার পরিধির কারণ নারীর সাথে ফিতনায় আপতিত হওয়ার আশংকার ওপর নির্ভরশীল। আর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে নারীর সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্র ও ফিতনার জায়গা হল তার মুখমন্ডল। যার ফলে তা আবৃত করা ওয়াজিব। যেন যৌনক্ষম পুরুষেরা তার চেহারা দেখে ফিতনায় নিপতিত না হয়।

(৫) আল্লাহর বাণী وَلاَ يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِن زِيْنَتِهِنَّ ‘তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে’ (নূর ৩১)।

অর্থাৎ মেয়েরা রাস্তায় এমন সজোরে হাঁটবে না যাতে তাদের পায়ে পরিহিত নুপুর ও গহনা যা দ্বারা পা অলংকৃত করে তার গোপনীয়তা প্রকাশ পায়। নারীদের নুপুর ও অনুরূপ গহনার শব্দ শুনে পুরুষদের ফিতনায় পতিত হওয়ার আসংকায় যখন তাদেরকে সজোরে পদক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তখন মুখমন্ডল খুলে কী করে রাস্তায় চলতে পারে?

কোনটা বেশী ভয়ংকর ফিতনা? যুবকের নারীর পায়ের গহনার শব্দ শুনা, সে যুবক জানে না সে কে ও তার সৌন্দর্যই বা কি? সে জানে না যে, সে যুবতী, না বৃদ্ধা? সুন্দরী না কুশ্রী? কোনটা বেশী ভয়ংকর ফিতনা? এটা, না-কি একজন যৌবন ভরা, মসৃণ ও কমনীয়া সুন্দরী নারীর প্রতি তাকানোতে, যা যৌনক্ষম প্রত্যেক পুরুষের দৃষ্টি কাড়ে ও ফিতনার দিকে টেনে নিয়ে যায়। যা দ্বারা জানা যায় কোনটা অতি বড় ফিতনা এবং আবৃত করা ও গোপন রাখা অধিক উপযুক্ত।

২য় দলীল : আল্লাহর বাণী

وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاء اللَّاتِيْ لاَ يَرْجُوْنَ نِكَاحاً فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَن يَّضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِيْنَةٍ وَأَن يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ-

‘বৃদ্ধা নারী যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বর্হিবাস (বাহ্যিক পোশাক) খুলে রাখে; তবে এটা হ’তে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (নূর ৬০)। আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণের দিক হ’ল, ঐ সকল বৃদ্ধা নারী যাদের অধিক বয়সের কারণে পুরুষদের সাথে বিবাহের আগ্রহ নেই, তাদের পোশাক খুলে রাখাকে আল্লাহ তা‘আলা অপরাধ হিসাবে গণ্য করেননি। আল্লাহ গোনাহ গণ্য করবেন না এ শর্তে যে, শোভা-সৌন্দর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে নগ্নতা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে হবে না। আরও জেনে রাখা দরকার যে, পোশাক খুলে রাখার অর্থ এই নয় যে, তারা উলঙ্গ অবস্থায় অবস্থান করবে। বরং এর অর্থ হ’ল সাধারণ জামা-চাদরের উপরের পোশাক খুলে রাখা যা সাধারণত ঢেকে রাখা হয় না, বরং অধিক সময় প্রকাশ থাকে যেমন মুখমন্ডেল ও কব্জিসহ দু’হাত।

অতএব বৃদ্ধা নারীদের জন্য অনুমোদিত উল্লিখিত পোশাক হ’ল লম্বা জামা বা দীর্ঘ চাদর, যা গোটা দেহ ঢেকে ফেলে। আর এই বৃদ্ধাদের ব্যাপারে বিধানকে বিশেষিত করাটাই প্রমাণ করে, যে সকল যুবতী বিবাহে আগ্রহী তাদের বিধান এর বিপরীত। আর যদি পোশাক খুলে রাখা ও জামা-ওড়না পরার ক্ষেত্রে সকল নারীর বিধান একই হয়, তাহ’লে বিশেষ করে বৃদ্ধাদের কথা আলোচনা করার যৌক্তিকতা থাকতো না।

আল্লাহর বাণী, غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِيْنَةٍ ‘সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে’ (নূর ৬০)। যুবতী নারী যে বিবাহের কামনা করে তার পর্দা ওয়াজিব হওয়ার অন্য একটি দলীল। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী যখন তার চেহারা খুলে রাখে সে তার সৌন্দর্য প্রকাশের দ্বারা নগ্নতার প্রদর্শনের ইচ্ছা করে। আর তার রূপ প্রকাশের মাধ্যমে তা পুরুষকে অবহিত করতে ও বিশেষভাবে তার প্রশংসা করা হোক এটাই সে চায়। এর বিপরীত বিষয় বিরল, আর এ বিরলের জন্য বিধান নয়।

৩য় দলীল : আল্লাহর বাণী-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلاَبِيْبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْراً رَّحِيْماً-

‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়, এতে তাদেরকে চেনা অধিক সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু’ (আহযাব ৫৯)।

প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মুমিন নারীদের এ মর্মে নির্দেশ দেন যে, যখন তারা প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হবে, তখন অবশ্যই একটা বড় চাদর দিয়ে মাথার উপর থেকে মুখমন্ডল ঢেকে দিবে এবং একটা চোখ খুলে রাখবে। ছাহাবায়ে কেরামের তাফসীর দলীল হিসাবে গণ্য। অধিকন্তু কতিপয় আলেম হাদীছটি মারফূ হওয়ার দাবী করেছেন। ইবনে আববাসের বাণী ويبدين عينا واحدا ‘কেবল একটা চোখ খোলা রাখবে’। এক চোখ খোলা রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে, কেবল পথ দেখার যরূরী প্রয়োজনে। যদি প্রয়োজন না হ’ত তাহ’লে এক চোখ খোলা রাখার অনুমতিও দেওয়া হ’ত না।

আর جلباب হ’ল বড় চাদর যা ওড়নার ওপর পরা হয়। যেমন আবা (এক প্রকার ঢিলা জামা বিশেষ)।

উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর আনছারী নারীরা যখন বাইরে বের হ’তেন তাদের মাথার উপর কালো কাপড় পরতেন, যেন তাদের মাথার উপর কালো কাক স্থির বসে আছে। আবু ওবাইদা সালমানী সহ অন্যান্যরা উল্লেখ করেন, মুসলিম নারীরা তাদের মাথার উপর দিয়ে বড় চাদর ঝুলিয়ে নিতেন, যাতে রাস্তা দেখার জন্য চোখদ্বয় ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশ পেত না।

৪র্থ দলীল :

আল্লাহর বাণী-

لَّا جُنَاحَ عَلَيْهِنَّ فِيْ آبَائِهِنَّ وَلَا أَبْنَائِهِنَّ وَلَا إِخْوَانِهِنَّ وَلَا أَبْنَاءِ إِخْوَانِهِنَّ وَلاَ أَبْنَاءِ أَخَوَاتِهِنَّ وَلاَ نِسَائِهِنَّ وَلاَ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ وَاتَّقِيْنَ اللهَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيْداً-

নবী পত্নীদের জন্য তাদের পিতৃগণ, পুত্রগণ, ভ্রাতৃস্পুত্রগণ ভগ্নিপুত্রগণ, সেবিকাগণ এবং তাদের অধিকার ভুক্ত দাস-দাসীগণের তা পালন না করা অপরাধ নয়। হে নবী-পত্নীগণ! আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করেন’ (আহযাব ৫৫)। হাফেয ইবনে কাছীর বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম নারীদেরকে পর-পুরুষদের থেকে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়ায় এ কথা স্পষ্ট হ’ল যে, এ সকল নিকট আত্মীয়দের থেকে পর্দা করা আবশ্যক নয়। যেমন আল্লাহ সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে وَلاَ يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلاَّ لِبُعُوْلَتِهِنَّ এসকল লোকদেরকে পৃথক করেছেন। কুরআন কারীমের উল্লিখিত চারটি দলীল পর পুরুষের থেকে মহিলাদের পর্দা ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়। আর প্রথম আয়াতটি নারীদের পর্দা ফরয হওয়ার বিষয়টি পাঁচটি দিক দিয়ে শামিল করে।

মুসলিম নারীর পর্দা ও চেহারা ঢাকার অপরিহার্যতা – ২

হাদীছ থেকে দলীল :

প্রথম দলীল : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَّنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَتِهِ وَإِنْ كَانَتْ لاَ تَعْلَمُ-

‘যখন তোমাদের কেউ কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে, তখন তাকে দেখাতে কোন গুনাহ হবে না। তবে কেবল বিয়ে করার উদ্দেশ্যেই দেখতে হবে, যদিও মেয়ে জানতে না পারে’।[1]

অত্র হাদীছে দলীল গ্রহণের দিক হ’ল নবী করীম (ছাঃ) বিশেষভাবে বিয়ের প্রস্তাব দানকারীর জন্য প্রস্তাবিত মেয়ের প্রতি তাকানোকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করেননি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিয়ের প্রস্তাবকারী ব্যতীত অন্য কেউ কোন অপরিচিতার দিকে তাকালে সর্বাবস্থায় পাপী হবে। অনুরূপভাবে প্রস্তাবকারী বিয়ের প্রস্তাব ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে তাকালে যেমন আনন্দ ও মজা পাওয়া বা অনুরূপ কোন কারণে তাকালে পাপী হিসাবে গণ্য হবে। যদি কেউ বলে কোন্ অঙ্গের প্রতি তাকাবে এটা তো হাদীছে বর্ণিত হয়নি। সুতরাং এর দ্বারা মেয়ের গ্রীবা ও বক্ষদেশের প্রতি তাকানো অর্থ হ’তে পারে? উত্তরে বলব, এ কথা সকলে জানে যে প্রস্তাবকারীর মূল উদ্দেশ্য মেয়ের সৌন্দর্য দেখা। আর সেটা হ’ল চেহারার সৌন্দর্য। এছাড়া তার অনুগামী অন্যান্য অঙ্গগুলির প্রতি অধিকাংশ সময় লক্ষ্য করা হয় না। প্রস্তাবকারী কেবল চেহারার দিকে তাকায়; কারণ সৌন্দর্য পিয়াসীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্দেহাতীতভাবে সেটাই। (অতএব মুখমন্ডল পর্দার অন্তর্গত)।

২য় দলীল :

عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ قَالَتْ أَمَرَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ نُخْرِجَهُنَّ فِىْ يَوْمِ الْفِطْرِ وَالنَّحْرِ. قَالَ قَالَتْ أُمُّ عَطِيَّةَ فَقُلْنَا أَرَأَيْتَ إِحْدَاهُنَّ لاَ يَكُوْنُ لَهَا جِلْبَابٌ قَالَ فَلْتُلْبِسْهَا أُخْتُهَا مِنْ جِلْبَابِهَا-

উম্মে আতিয়া (রাঃ) বলেন, যখন নবী করীম (ছাঃ) নারীদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার ছালাতে বের হওয়ার নির্দেশ দিলেন। উম্মু সালমা বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি আমাদের মধ্যে কারো চাদর না থাকে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তার বোন তাকে চাদর পরাবে’।[2]

অত্র হাদীছ প্রমাণ বহন করে যে, মহিলা ছাহাবীদের অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা বড় চাদর না পরে বাইরে বের হ’তেন না। চাদর না থাকলে বের হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভবও হ’ত না। আর এজন্য তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট তাঁদের প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করলেন, যখন তাদের ঈদের ছালাতে বের হ’তে বলা হ’ল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অন্য মুসলিম বোনের চাদর পরে ঈদগাহে গমন করতে বলে এ প্রশ্নের সমাধান দিলেন। কিন্তু তাঁদেরকে চাদর ছাড়া বের হওয়ার অনুমতি দেননি, যদিও ঈদগাহে ছালাত আদায়ের জন্য বের হওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শরী‘আত সম্মত।

অতএব যখন নারীদের চাদর পরিধান ব্যতীত শরী‘আত সম্মত স্থানে যাবার অনুমতি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দিলেন না, তখন চাদর পরিধান ছাড়া শরী‘আত অননুমোদিত স্থানে যাওয়ার অনুমতি তিনি কি করে দিতে পারেন, যেখানে যেতে তারা বাধ্য নয়? বরং তা হ’ল কেবল বাজারে ঘুরা-ফিরা, পুরুষদের সাথে মিলা-মিশা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, যাতে কোন উপকারিতা নেই। আর চাদর পরার নির্দেশই মুখমন্ডল পর্দা করার প্রমাণ বহন করে। আল্লাহই অধিক অবগত।

৩য় দলীল :

عَائِشَةَ قَالَتْ لَقَدْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّى الْفَجْرَ، فَيَشْهَدُ مَعَهُ نِسَاءٌ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ مُتَلَفِّعَاتٍ فِىْ مُرُوْطِهِنَّ ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى بُيُوْتِهِنَّ مَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ-

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফজরের ছালাত পড়াতেন। আর মুমিন মহিলাগণ সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে ফজরের ছালাতে উপস্থিত হ’তেন। অতঃপর ছালাত শেষ করে তারা যার যার বাড়িতে ফিরে যেতেন, আধারের কারণে তাদেরকে চেনা যেত না।[3] আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমরা এখন নারীদের যে অবস্থায় দেখছি, যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ অবস্থায় তাদের দেখতেন, তাহ’লে তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন, যেভাবে বনু ইসরাঈলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল।[4] ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকেও এরূপ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীছ দ্বারা দু’ভাবে দলীল গ্রহণ করা যায়-

(ক) পর্দা করা মহিলা ছাহাবীদের অভ্যাস ছিল, যাঁরা ছিলেন উত্তম যুগের, আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানী, শিষ্টাচারী, সৎচরিত্রবান, পূর্ণ ঈমানদার ও সৎআমলকারিণী। তাঁরা সৎ ও শ্রেষ্ঠ ছিলেন, যাঁদের প্রতি ও তাঁদের উত্তম অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَالسَّابِقُوْنَ الأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا أَبَداً ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ-

‘মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্ত্তত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, এটা মহা সাফল্য’ (তওবাহ ১০০)।

মহিলা ছাহাবীদের পথ চলা যদি এমনটি হয়, তাহ’লে আমাদের জন্য কী করে সমীচীন হবে উক্ত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া? যে পথের পথিক ও তাদের একনিষ্ঠ অনুসারীদের জন্য আল্লাহর সন্তোষ রয়েছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيْراً- ‘কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে ফিরিয়ে দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর তা কত মন্দ আবাস’ (নিসা ১১৫)।

(খ) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) যাঁরা ইলম ও ফিক্বহে ছিলেন দক্ষ, ধর্মীয় জ্ঞানে ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং আল্লাহর বান্দাদের ব্যাপারে ছিলেন নছীহতকারী। তাঁরা বলছেন যে, বর্তমান নারীদের অবস্থা দেখলে রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে মসজিদে ছালাত আদায় করতে যেতে অবশ্যই নিষেধ করতেন।[5] অথচ সেটা ছিল উত্তম যুগ, সে যুগেও নবী করীম (ছাঃ)-এর যামানায় যে অবস্থা ছিল তা পরিবর্তিত হয়ে মাহিলাদের মসজিদে গমন নিষিদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তাহ’লে ১৩ শতাব্দী পরে এসে আমাদের যুগের অবস্থা কেমন হয়েছে? এযুগে সবকিছুর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, লজ্জাশীলতা কমে গেছে এবং অধিকাংশ মানুষের অন্তরে ধর্মীয় অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর আয়েশা ও ইবনে মাসঊদ (রাঃ) উভয়ে শরী‘আতের দলীল যে বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে তা পূর্ণাঙ্গরূপে বুঝেছিলেন যে, প্রত্যেক কাজ যা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে তা নিষিদ্ধ।

৪র্থ দলীল :

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاَءَ لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. فَقَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ فَكَيْفَ يَصْنَعْنَ النِّسَاءُ بِذُيُوْلِهِنَّ قَالَ يُرْخِيْنَ شِبْرًا. فَقَالَتْ إِذًا تَنْكَشِفَ أَقْدَامُهُنَّ. قَالَ فَيُرْخِيْنَهُ ذِرَاعًا لاَ يَزِدْنَ عَلَيْهِ-

ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গর্বভরে তার কাপড় হেঁচড়িয়ে চলে ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না’। উম্মে সালমা বললেন, তাহ’লে মহিলারা তাদের অাঁচল কী করবে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘এক বিঘত ঝুলিয়ে পরবে’। উম্মে সালমা বললেন, তবে তো তাদের পা প্রকাশ হয়ে পড়বে। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘এক হাত ঝুলিয়ে দিবে, তার থেকে বেশি করবে না’।[6]

এ হাদীছ মহিলাদের পা ঢেকে রাখা ওয়াজিব হওয়ার দলীল। আর এটা মহিলা ছাহাবীদের নিকট খুবই পরিচিত ও জানা ছিল। নিঃসন্দেহে দু’পায়ের গোড়ালী খোলা রাখার ফিতনা, মুখমন্ডল ও দু’কব্জি খোলা রাখার তুলনায় নগণ্যতর। সুতরাং নগণ্য ফিতনার ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার করার মাধ্যমে বড় ফিতনা ও হুকুমের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতর বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আর শরী‘আতের হেকমত হচ্ছে ছোট বা হালকা ফিতনায় বিধান হালকা করা এবং গুরুতর ফিতনার ক্ষেত্রে কঠিন করা। এর বিপরীত করলে সেটি হবে আল্লাহর হেকমত ও শরী‘আতের মধ্যে দন্দ্ব সৃষ্টি করা।

৫ম দলীল :

قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا كَانَ لإِحْدَاكُنَّ مُكَاتَبٌ وَكَانَ عِنْدَهُ مَا يُؤَدِّى فَلْتَحْتَجِبْ مِنْهُ-

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যদি কোন নারীর নিকট চুক্তিবদ্ধ দাস থাকে আর তার চুক্তিকৃত অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য থাকে, তাহ’লে সে নারী তার থেকে পর্দা করবে’।[7] এ হাদীছ থেকে দলীল গ্রহণের দিক হ’ল, মনিব নারী তার দাসের সামনে ততক্ষণ মুখ খোলা রাখতে পারবে, যতক্ষণ সে তার মালিকানাধীন থাকবে। যখন তার মালিকানার বাইরে চলে যাবে, তখন তার থেকে পর্দা করা ওয়াজিব হবে। কারণ সে তখন পরপুরুষে পরিণত হয়ে গেল। অতএব পরপুরুষ থেকে নারীর পর্দা করা আবশ্যক সাবস্ত হ’ল।

৬ষ্ঠ দলীল :

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّوْنَ بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْرِمَاتٌ فَإِذَا حَاذَوْا بِنَا سَدَلَتْ إِحْدَانَا جِلْبَابَهَا مِنْ رَأْسِهَا عَلَى وَجْهِهَا فَإِذَا جَاوَزُوْنَا كَشَفْنَاهُ-

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিয়ে আরোহী অতিক্রম করছিল, আর আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে মুহরিম ছিলাম। যখন আরোহী আমাদের বরাবর হ’ত, তখন আমাদের প্রত্যেকে স্ব স্ব চাদর মাথার দিক দিয়ে চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিত। অতঃপর যখন তারা আমাদের অতিক্রম করত, তখন আমরা চাদর সরিয়ে ফেলতাম।[8]

আয়েশা (রাঃ)-এর উক্তি ‘আরোহীরা যখন আমাদের বরাবর হ’ত তখন আমাদের প্রত্যেকে মুখমন্ডলের উপর তার চাদর ঝুলিয়ে দিত’। এটি চেহারা ঢাকা আবশ্যক হওয়ার বড় দলীল। কেননা ইহরাম অবস্থায় চেহারা খুলে রাখা শরী‘আত সম্মত। যদি মুখ খুলে রাখার ব্যাপারে শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা না থাকত, তাহ’লে চেহারা খুলে রাখা ওয়াজিব হ’ত আরোহীদের সামনেও।

উপরোক্ত আলোচনা সুস্পষ্ট। অধিকাংশ আলেমের নিকটে ইহরাম অবস্থায় নারীর চেহারা খুলে রাখা ওয়াজিব। আর ওয়াজিব বিষয়ই কেবল অন্য ওয়াজিব বিষয়ের মুকাবেলা করতে পারে। সুতরাং যদি পরপুরুষের নিকট নারীর পর্দা করা ও চেহারা ঢাকা ওয়াজিব না হ’ত, তাহ’লে ইহরাম অবস্থায় মুখমন্ডল খোলার মতো ওয়াজিব কাজ ত্যাগ করার অনুমোদন দেওয়া হ’ত না।

বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে আছে, إِنَّ الْمَرْأَةَ المُحْرِمَةَ تُنْهَى عَنْ النِّقَاب وَالْقُفَّازَيْنِ ‘মুহরিম নারীগণকে হাতমোযা ও নিকাব পরা থেকে নিষেধ করা হয়েছে’। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, এটা প্রমাণ করে যে, নিকাব ও হাতমোযার ব্যবহার মহিলাদের মধ্যে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল, যারা মুহরিম ছিলেন না। এর দ্বারা তাদের চেহারা ও হাতসমূহ ঢেকে রাখার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।[9] হাদীছের উল্লিখিত এ ছয়টি দলীল মহিলাদের পর্দা করা ও পরপুরুষ থেকে মুখমন্ডল ঢাকা ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ। এর সাথে আমি কুরআনের চারটি দলীল সংযুক্ত করেছি। যাতে কিতাব ও সুন্নাতের দশটি দলীল হ’ল।

[এতদসঙ্গে হাদীছ থেকে আরো কিছু দলীল অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত হ’ল।

(1) عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِيْ بَكْرٍ الصِّدِّيْقِ قَالَتْ كُنَّا نُغَطِّيْ وُجُوْهَنَا مِنَ الرِّجَالِ، وَكُنَّا نَمْتَشِطُ قَبْلَ ذَلِكَ فِي الاِحْرَامِ-

Text Box: আসুন! শিরক ও বিদ‘আত মুক্ত ইসলামী জীবন যাপন করি। -আহলেহাদীছ আন্দোলন (১) আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) বলেন, আমরা পুরুষদের হ’তে আমাদের চেহারা ঢেকে রাখতাম এবং ইহরামের পূর্বে চিরুনী করতাম।[10]

(২) عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ قَالَتْ رَأَيْتُ عَائِشَةَ طَافَتْ بِالْبَيْتِ وَهِيَ مُنْتِقَبَةٌ-

(২) ছাফিয়্যাহ বিনতে শায়বাহ বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ)-কে নিকাব পরিহিত অবস্থায় কা‘বা ঘর তওয়াফ করতে দেখেছি।[11]

(3) عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ لَمَّا اجْتَلَى النَّبِيُ صلى الله عليه وسلم صَفِيَّةَ رَأَى عَائِشَةَ مُنْتَقِبَةً وَسْطَ النَّاسِ فَعَرَفَهَا-

(৩) ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী করীম (ছাঃ) ছাফিয়্যাহকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন তিনি আয়েশা (রাঃ)-কে মানুষের মাঝে নিকাব পরিহিত দেখে চিনতে পারলেন।[12]

(4) عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها زَوْجِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَتْ …. فَبَيْنَا أَنَا جَالِسَةٌ فِىْ مَنْزِلِىْ غَلَبَتْنِىْ عَيْنِىْ فَنِمْتُ، وَكَانَ صَفْوَانُ بْنُ الْمُعَطَّلِ السُّلَمِىُّ ثُمَّ الذَّكْوَانِىُّ مِنْ وَرَاءِ الْجَيْشِ، فَأَدْلَجَ فَأَصْبَحَ عِنْدَ مَنْزِلِىْ، فَرَأَى سَوَادَ إِنْسَانٍ نَائِمٍ، فَأَتَانِىْ فَعَرَفَنِىْ حِيْنَ رَآنِىْ، وَكَانَ يَرَانِىْ قَبْلَ الْحِجَابِ، فَاسْتَيْقَظْتُ بِاسْتِرْجَاعِهِ حِيْنَ عَرَفَنِىْ فَخَمَّرْتُ وَجْهِىْ بِجِلْبَابِىْ

(৪) আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার তাবুতে ছিলাম, আমার চক্ষু আমার উপর প্রভাবিত হ’ল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ছাফওয়ান বিন মু‘আত্তাল আস-সুলামী সৈন্যদের পিছনে লক্ষ্য রাখছিল। সৈন্যরা রাত্রের প্রথম প্রহরে চলে আসল। তিনি আমার তাবুর নিকট সকাল করলে দেখতে পেলেন ঘুমন্ত কালো একজন মানুষ। অতঃপর তিনি আমার নিকট আসলেন এবং আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। তিনি আমাকে পর্দার বিধানের পূর্বে দেখেছিলেন। তিনি আমাকে চিনতে পেরে ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়লে আমি জাগ্রত হই। আমি (তাকে দেখে) আমার চাদর দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত করলাম। অন্য বর্ণনায় আছে, পর্দা করলাম (দীর্ঘ হাদীছের অংশ)।[13] আলোচ্য হাদীছগুলি প্রমাণ বহন করে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় মহিলা ছাহাবীগণ চেহারা ঢেকে পর্দা করতেন।]

বিষয়: বিবিধ

১৩৪৫ বার পঠিত, ০ টি মন্তব্য


 

পাঠকের মন্তব্য:

মন্তব্য করতে লগইন করুন




Upload Image

Upload File