জিহাদী বই

লিখেছেন লিখেছেন এলিট ৩০ অক্টোবর, ২০১৪, ০৬:২৭:৩১ সকাল



মহল্লাতে একটা ছোটখাটো অনুস্টান হবে। সেই অনুস্টানর উদ্যোক্তারা নিজেরা সাধ্যমতন টাকা পয়সা দিল। এর পরে এলাকাবাসীর কাছ থেকে চাদা তুলতে লাগল। কিছু সেচ্ছাসেবীরা এই চাদা তোলার জন্য এলাকাবাসীর দুয়ারে দুয়ারে ধন্যা দিল। এলাকাবাসীরাও সাধ্যমতন টাকা পয়সা দান করছে। এতে কোন জোর জবরদস্তি নেই। যার ইচ্ছে সে চাদা দিল যার ইচ্ছে নেই সে দিল না। যারা চাদা আদায় করে তারা কিন্তু এক প্রকারের অসহায় হয়েই সাহায্য চাওয়ার মতন চাদা চায়। এটাই হল চাদা। কিন্তু এই জামানাতে “চাদাবাজী” নামক একটা নতুন শব্দ আমরা পেয়েছি। এটা কিন্তু যে আদায় করে সে মস্তো বড় ক্ষমতাশীল। যে এই চাদা দেয় সে হল সবচেয়ে অসহায়। চাদাবাজী জিনিসটা এখন এক ধরনের ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

কিছু কুলাঙ্গারের হাতে পড়ে চাদা জিনিসটা যেমন দান থেকে ডাকাতিতে পরিনত হয়েছে। ঠিক তেমনি কিছু কুলাঙ্গারের হাতে পড়ে ইসলাম রক্ষায় ক্ষেত্র বিশেষে অস্ত্র তুলে নেওয়ার জিহাদ এখন সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কর্মকান্ডে পরিনত হয়েছে। আন্তঃজাতিক বিশ্বে এমন জিহাদের অপব্যবহার আমরা দেখতে পাই। কোন স্কুলের ২০০ ছাত্রী অপহরন করা কিংবা চামড়া সাদা থাকার অপরাধে গলা কেটে মেরে ফেলা এখন জিহাদ নাম দেওয়া হচ্ছে। এরাই আসলে ইসলাম বিরোধীদেরকে আরো সুযোগ করে দিচ্ছে যাতে ওরা ইসলামকে সন্ত্রসী বলতে পারে।

আমাদের দেশে ইসলামী জঙ্গী ছিল না বললেই চলে। এমনকি বাংলাদেশে যে ইসলামী জঙ্গী নেই এমন তথ্যও উঠে এসেছিল বিভিন্ন আন্তঃজাতিক মহলের সমীক্ষাতে। গত বেশ কয়েক বছরে এমন জঙ্গীদের অনেকে ধরা পড়েছে, সাজা হয়েছে। এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কেউওই পছন্দ করে না। বাংলাদেশ এমন জঙ্গি মুক্ত হোক এই কামনা করি।

আগে কোন ইসলামী সন্ত্রাসী বা জঙ্গী ধরা পড়লে তার কাছে অস্ত্র, বোমা, অবৈধ সরঞ্জাম, নিষিদ্ধ দলের লিফলেট ইত্যাদি পাওয়া যেত। মিডিয়াতে আসত – অমুক জঙ্গীর কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র, বোম তৈরির সরঞ্জনাম ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। এসবের ছবিও আমরা দেখেছি মিডিয়ার কল্যানে। এর পরে দেখা গেছে এই অস্ত্র –বোমা ইত্যাদির সাথে জঙ্গীদের কাছ থেকে জিহাদী বইও উদ্ধার করা হয়। আরো পরে দেখা গেছে বা দেখা যাচ্ছে – অস্ত্র বা বোমা নয়, শুধু জীহাদি বই ও এর সাথে কোরআন ও হাদিস উদ্ধার করা হয়। দু একটা ঘটনাতে শুধু কোরআন হাদিসই উদ্ধার করা হয়েছে। কোন অস্ত্র নয়, বোমা নয়, জিহাদী বইও নয় – শুধু কোরআন ও হাদিস। এসব নিজের চোখে দেখিনি। সবই মিডিয়ার কল্যানে পাওয়া তথ্য।

“জিহাদী বই” জিনিসটা কি, কোন বইকে জিহাদী বই বলা যায় বা এতে কি লেখা থাকে এসব বিষয়ে সুনির্দিস্ট কোন নিয়ম নীতি আছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে সাধারন জ্ঞানে যেটুকু বোঝা যায় তা হল যে বইতে জিহাদের আহবান জানানো হয়। না, সঠিক ইসলামী জিহাদ নয়, সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের জিহাদ। হয়ত এই বইতে এমন সন্ত্রসী কর্মকান্ড করতে উতসাহ দেওয়া হয়। নতুবা এই বইতে শেখানো হয় যে সন্ত্রসী কজগুলো কিভাবে করতে হয়। সন্ত্রসী কাজগুলো কি? জ্বালানো পোড়ানো আর মানুষ হত্যা করা।

যে দেশের মানুষের মিছিলের প্রিয় স্লোগান হল “জ্বালো, জ্বালো, আগুন জ্বালো” কিংবা “অমুকের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে” অথবা “একটা কইরা অমুক ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”। সেই একই দেশে জ্বালানো পোড়ানো আর হত্যার মতন সন্ত্রসী কাজে উতসাহ দেওয়া বই সাথে রাখার জন্য জেল হতে পারে। হ্যা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের উতসাহ বা শিক্ষা দেওয়াটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধের অপরাধী হল সেই বইয়ের লেখক, প্রকাশক, মুদ্রনকারী, সরবরাহকারী, আমদানীকারী, বিক্রেতা এবং সবশেষ পাঠক। এমন জিহাদী বই তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। এটা অবশ্যই কেউ লিখেছে, কেউ ছেপেছে, কেউ আমদানী বা সরবরাহ করেছে। ওরা তো পাঠকের চেয়ে শতগুন বেশী অপরাধী। তাদের কেউ কোনদিন ধরা পড়েছে বা সাজা হয়েছে এমন কখনো শোনা যায়নি।

এমন জিহাদী বই দেখার বা পড়ার সুযোগ কখনো হয়নি। তবে আমার বিশ্বাস, যে জিহাদী বইটি সহ কাউকে গ্রফতার করা হয় সেই বইটিই হয়ত একই সময়ে বহাল তবিয়তে অনেক লাইব্রেরী ও বইয়ের দোকানে শোভা পাচ্ছে। ওখানে সেটাকে জিহাদী বই মনে হয় না। ওই বইটি “জিহাদী বই” এর মর্যাদায় পৌছে গ্রেফতারকৃত কারো কাছে পাওয়া গেলে। তাছাড়া কারো কাছে সত্যিকারের জিহাদী বই পাওয়া গেলে, বইটি নিষিদ্ধ হতো, লেখকের বিচার হতো, ছাপাখানা বন্ধ হতো। এমন কোনদিন হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

সবকিছু দেখে একটা সম্ভাবনা উকি দেয়। জিহাদী বই আসলে মিডিয়ার প্রচার ছাড়া আর কিছুই না। যে কোন বই পাওয়া গেলেই সেটা কে জিহাদী বই নাম দেওয়া হয়। এভাবে ক্ষেত্র বিশেষে, দলীয় কারনে বা উপরের নির্দেশে গ্রফতার করার অজুহাতটা জোরদার হয়। জিহাদী বই পাওয়া গেছে অমুক দলের কর্মীর কাছ থেকে – এই কথাটা মিডিয়াতে প্রচার করে ওই দলটিকেও সন্ত্রসী বানানো যায়। মিডিয়া কিন্তু সাধারনত কোন জিহাদী বইয়ের নাম প্রকাশ করে না। কারন, নাম প্রকাশ করলে সেই বইটি “জিহাদী বই” কিনা সেটা মানুষ খুজে বের করতে পারবে। এগুলো সবই সম্ভাবনার কথা। এর কোন প্রমান আমার কাছে নেই।

কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে কস্টের, সেটা হল, মিডিয়াতে যখন প্রচার করা হয় কোরআন ও হাদিস এর কথা। অমুক স্থান থেকে অমুক দলের সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যাস এখানেই তো কথা শেষ হয়ে যায়। মিডিয়া সেখানে না থেমে বলে - তার কাছ থেকে জিহাদী বই ও কোরআন-হাদিস উদ্ধার করা হয়েছে। দু একটি ঘটনাতে তো শুধুই কোরআন-হাদিস উদ্ধার করা হয়েছে। এভাবে কিন্তু এমন একটা অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে যে - কোরআন-হাদিস সাথে রাখাটাই যেন অপরাধ। কোরআন-হাদিস ও যেন জিহাদী বই হয়ে গেছে।

মাইরের ভয় সবারই আছে। ভন্ড পীর, ভন্ড কবিরাজ ইত্যাদির কথা মিডিয়াতে আসলেও দেশের সনামধন্য ৪-৫ জন্য ভন্ড পীরে ও মাজার ব্যাবসার বিরুদ্ধে কোন মিডিয়া কোনকালেই মুখ খোলেনি। কারন সেই পীরদের লক্ষ লক্ষ ভক্ত আছে। পীরের বিরুদ্ধে কিছু লিখলে, চড় মেরে ঐ রিপোর্টারের দাত ফেলে দিবে। আমাকেই দেখেন , আমি নিজেও ওই পীরদের নাম লেখার সাহস পাইনি। আমাদের দেশে পীরের ভক্ত আছে – ইসলামের ভক্ত নেই। ইসলামের ভক্ত থাকলে, গ্রেফতারের সময় কাছে পাওয়া জিনিসের তালিকাতে কোরআন ও হাদিসের নাম লিখতে কোন মিডিয়া সাহস পেতো না।

৫-৭ বছর আগে অস্ট্রেলীয়ার মেলবোর্নে কিছু স্থানীয় বখাটে ছেলেরা ভারতীয় কিছু ছাত্রকে বেদম মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। এই ঘটনাটা ভারতের মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ার পরে সারা ভারত থেকে ৬০ হাজার ছাত্র ভিসা পাওয়ার পরেও অস্ট্রলিয়াতে যায়নি। ওদের কথা একটাই – যে দেশে আমাদের জাতীর ছেলেদেরকে মেরেছে ওখানে আমরা যেন যাব? বিদেশী ছাত্ররা অস্ট্রেলীয়া সরকারের একটা বড় আয়ের মাধ্যম। এ কারনে বাধ্য হয়ে অস্ট্রেলীয়ার পররাস্ট্র মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী ভারতে গিয়ে কয়েকটি শহরে সেমিনার করে এক প্রকারের ক্ষমা চেয়ে এসেছে। একেই বলে দেশপ্রেম, স্বজাতী প্রেম, একেই বলে প্রতিবাদ। শুধু জ্বালালে, পোড়ালে আর পেটালেই প্রতিবাদ হয়না।

কোরআন – হাদিস নিয়ে মিডিয়ার এই ধৃস্টতার জন্য তাদেরকে চড় থাপ্পর মারতে হবে না। সবাই মিলে একসাথে তাদেরকে বর্জন করলেই হবে। সুরসুর করে মিডিয়া তখন বুঝে শুনে, হুশ করে লিখবে। কিন্তু বর্জনটাও আমরা করি না বা করতে পারি না। কারন একটাই, আমরা পীর-মাজার ভক্ত হলেও ইসলাম ভক্ত হতে পারিনি। আমরা শুধু নামেই মুসলমান

বিষয়: বিবিধ

২৫১৯ বার পঠিত, ৪ টি মন্তব্য


 

পাঠকের মন্তব্য:

279526
৩০ অক্টোবর ২০১৪ সকাল ০৭:০৪
কাহাফ লিখেছেন :
লেখা পড়লাম,ভাল লাগার সাথে সাথে নিজেদের ইসলাম বিমুখতার উপলব্ধটাও অনুভূতি কে নাড়া দিল! আমরা কী আসলেই মুলমান! স্বীয় ঈমানী দায়িত্ব কত টুকু পালন করছি!
মুসলিমদের বিদ্যমান বেহুশতা সমাজ কে ধংশের চুরাবালীতে নিয়ে যাচ্ছে!
279528
৩০ অক্টোবর ২০১৪ সকাল ০৮:০৭
মামুন লিখেছেন : লিখাটি পড়লাম। ভালো লেগেছে। ভালো লাগা রেখে গেলাম। ধন্যবাদ। Rose Rose
279807
৩০ অক্টোবর ২০১৪ রাত ০৯:২১
শেখের পোলা লিখেছেন : " আমরা শুধু নামেই মুসলমান"
এটাই মোদ্দা কথা৷ আসুন সত্যিকারের মুসলমান হই৷
287733
২৫ নভেম্বর ২০১৪ সকাল ০৭:৩৮
চলাচল লিখেছেন : ভালো লাগলো ধন্যবাদ

মন্তব্য করতে লগইন করুন




Upload Image

Upload File