মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দ্রষ্টা, আজকে তাঁর ১৪০তম জন্মদিন
লিখেছেন লিখেছেন চাটিগাঁ থেকে বাহার ২২ আগস্ট, ২০১৫, ০৯:০২:৪৬ রাত
চট্টগ্রামের ইতিহাসের কালজয়ী মহাপুরুষ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তী নেতা,শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, এদেশে বাংলায় প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার প্রথম মুসলমান সম্পাদক, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য, মাওলানা মনিরুজ্জামান ।
জন্ম: ইসলামাবাদীর ১৪০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৭৫ সালের ২২ আগস্ট তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা আডালিয়ার চর-এ জন্মগ্রহণ করেন।
বংশ: পিতা মতিউল্লাহ পন্ডিত মাতা রহিমা বিবি পিতামহ খান মোহাম্মদ । তৎপিতা খোষাণ মোহাম্মদ তৎপিতা আখিল মোহাম্মদ তৎপিতা মহাম্মদ ফতে শাহ আদি বাড়ি হাটহাজারী থানার ফতেয়াবাদ । তিনি ছিলেন নসরত শাহের বংশের লোক । ফতেহ শাহের পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ নসরত শাহ জ্ঞানের আলোক দানের জন্যে আড়ালিয়া পুকুরিয়া ও চরতি গ্রামের জায়গীর দেন । কাছারী ছিল পুকুরিয়া পাহাড়ে । তাঁর পু্র্বপুরুষদের জায়গীরদারীর অহংকার ছিলনা । তাঁরা পুঁথিপত্র ব্যাখ্যা করতেন । তাঁদের বংশের শেষ পন্ডিত আকাম উদ্দিন ।
শিক্ষাজীবন: পার্শ্ববর্তী শংখ নদীর অপর পারে সাতকানিয়া থানার চরতি গ্রামের জনৈক মৌলীর নিকট তিনি কোরান শরীফ ও বাল্যশিক্ষা পড়েন । শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে আব্বা আম্মা তাকে তখন অল্প বয়সে পাঠিয়ে দিলেন সুদুর কলিকাতায় । হুগলী মাদ্রাসা থেকে তিনি ১৮৯৫ সালে কৃতিত্বের সাথে সনদ লাভ করেন । ১৯ বছর বয়সে তিনি পড়ালেখা শেষ করেন ।
শিক্ষকতা: হুগলী সরকারী মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষকতার চাকরির প্রস্তাব পেলেও স্বাধীনচেতা মাওলানা ঐ চাকরী না করে রংপুরে দুটি বেসরকারী মাদ্রাসায় চাকরি করেন । পরে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড মাদ্রাসার সুপারিনটেণ্ডেন্ট হিসেবেও কাজ করেন । মুন্সি পাড়া মাদ্রাসার তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ।
মাওলানা মনিরুজ্জামান বাংলা পড়তে জানতেন না, কারণ সে সময় মাদ্রাসায় বাংলা পড়ানো হত না । তিনি দেশ বিদেশের খবর পড়ার জন্য অনেক কষ্ট করে বাংলা শিখে তারপর পত্রিকা সমূহ পড়তেন । পড়ে তিনি বাংলায় এত দক্ষতা অর্জন করেন যে ঐ সব পত্রিকায় উনার লেখা বের হতে থাকে ।
মাওলানা মনিজরুজ্জামান ইসলামাবাদী সম্পর্কে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেন- যার সমাজ সংস্কারে, ঐতিহাসিক সত্যের অনুসন্ধ্যানে, মুসলমানদের সকল প্রকার উন্নয়ণমূলক প্রচেষ্টায়, সংবাদপত্রের সম্পাদনা ও পরিচালনায়, আজাদীর সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্বে ত্যাগ ও নিরলস কর্তব্যপরায়ণতা দেশ ও জাতি কোনদিন ভুলতে পারবেনা । নিজ মত ও আদর্শের প্রতি মাওলানা মনিরুজ্জামানের ছিল অগাধ বিশ্বাস ও অনুরাগ । শত বিপদ আপদের মধ্যেও তিনি মত ও আদর্শকে বিসর্জন দিতেন না । এজন্য তিনি অকাতরে যে কোন দু:খ কষ্ট বরণ করে নিতে পারতেন ।
তিনি ছিলেন এদেশে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার প্রথম মুসলমান সম্পাদক । তাঁর সম্পাদনায় ও সাংবাদিকতায় প্রকাশিত হয় সোলতান (১৯০১), হাবলুল মতিন (১৯১২), মোহাম্মদী (১৯০৩), কোহিনুর (১৯১১), বাসনা (১৯০৪) এবং আল এছলাম পত্রিকা ।
কর্মজীবন:
১৯৩০ সালে তিনি চট্টগ্রামের কদমমোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময়ে তিনি কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা হারান এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন দান করে ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগদান করেন। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগদান ও আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যক্রমের প্রতি সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা। সে সময় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে কার্যক্রমের প্রতি সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেন। সে সময় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন করেন। নেতাজী যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দখল করে ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উড়িয়ে ‘দিল্লী চলো’ শ্লোগান তুলে এগিয়ে চলছিলেন ভারতের দিকে ঐ সময় মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সাথে পরিচয় ঘটে বেংগল ভলান্টিয়ার্স এর সুবোধ চক্রবর্তীর। সুবোধের সাথে আলাপ করে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এত বেশি মুগ্ধ হন যে শেষ বয়সে একটা ঝুঁকি নেবার জন্য রাজি হয়ে পড়েছিলেন। সুবোধকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে আসেন চট্টগ্রামের দেয়াং পাহাড়ে। চট্টগ্রামের পাহাড়-পর্বত ডিঙ্গিয়ে আরাকানের পথ ধরে আবারো নেতাজীর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে যখন পথ চলছিলেন তখন সীমান্ত এলাকায় ছিল সতর্ক পাহারা। আজাদ হিন্দ ফৌজ দখলে থাকার কারণে সতর্কতা যেন সীমাহীন হয়ে পড়েছিল।
মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বীরকণ্ঠে তার সহচরকে বলছিলেন- আমার জীবনের মাত্র কয়েকদিন বাকি, এই চরম ঝুঁকি নিতে আমার অসুবিধেও নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুঁকি নিলেন- শ্যালক মোর্শেদকে নিয়ে একেবারে ফকির সেজে নেতাজীর সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন। ব্রিটিশ গুপ্তচরেরা তখন মাওলানার সমস্ত বিপ্লবী কার্য টের পায়। সে কারণে তার শহরস্থ বাড়ি, তৎকালীন পটিয়ার (বর্তমান চন্দনাইশ) বাড়ি, সীতাকুন্ডের বাড়ি, কলকাতার বাসভবনে ইংরেজ সার্জেন্টের নেতৃত্বে বিপুল সৈন্যের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হয়। ঐ সময় মওলানাকে চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত জহরলাল নেহরু প্রভৃতি নেতার সাথে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীকেও দিল্লীর লালকিল্লায় বন্দী করে রাখেন। অতঃপর তাঁকে সেখান থেকে পাঞ্জাবের ময়াওয়ালী জেলে স্থানান্তর করেন। সেখানকার জেলের ছাদের বিমের সঙ্গে রজ্জু দিয়ে ৬৫ বছর বয়স্ক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর দু’পা বেঁধে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে রেখে তাঁর উপর অশেষ নির্যাতন চালানো হয়েছিল গোপন তথ্য জানার জন্য।
আরবী বিশ্ববিদ্যায়: চট্টগ্রামে এক বিরাট সম্মেলনের পর পটিয়া থানার দেয়াং এর পাহাড়ে ৬শত বিঘা জমির উপর মাওলানা শওকত আলী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিস্থাপন করেন । স্থানটি এখনও সরকারের হাতে পড়ে আছে ।
মৃত্যু: ১৯৫০ সালের ২৪শে অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না.....রাজেউন) ।
চট্টগ্রাম কদম মোবারক এতিমখানার পাশে তাঁকে কবর দেয়া হয় ।
সূত্র:
# মাওলানা ইসলামাবাদী, সম্পাদনা-সৈয়দ মোস্তফা জামাল
# উইকিপিডিয়া
# দৈনিক আজাদী (২২/০৮/১৫ইং)
বিষয়: বিবিধ
১২০৪ বার পঠিত, ৮ টি মন্তব্য
পাঠকের মন্তব্য:
মুসলিম সাংবাদিকতা ও পত্রিকা প্রকাশ এর অগ্রপুরুষ ছিলেন তিনি। তিনি একজন ইসলামি ব্যাক্তিত্বই ছিলেন।
চট্টগ্রামে তিনি অন্যতম মুসলিম আলেম, যাঁর লিখনী ও বক্তব্যে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই ঐকমত্য পোষণ করতেন। তিনি সারা ভারতে পরিচিত ছিলেন এবং ব্রিটিশের দুঃচিন্তার কারণ ছিলেন। তার ক্ষুরধার লিখনী ঘুমন্ত মানুষকে আজাদী পাগল করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে হাজির করত।
বর্তমানে প্রচুর আলেম আছে কিন্তু বাগ্মীতা নাই। প্রচুর আলেম ওয়াজ করেন কিন্তু ওয়াজে সচেতনতা সৃষ্টি হয়না। বিপ্লবী চিন্তার আলেমের বড় অভাব। আল্লাহ মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদীকে জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিবাসী করুন।
একজন সচেতন ব্লগার হিসেবে এই বিষয়টি সামনে আনার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বছরে অন্তত একটি দিন তাঁর স্মৃতির জন্য
আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ
আপনাকে অনেক ধনযবাদ
মন্তব্য করতে লগইন করুন